চিত্রঃ কবি, লেখক, ব্লগার ও পূবালী ব্যাংকার ইসফাকুর রহমান কুরেশী ও সহধর্মিণী ডাঃ নূরজাহান বেগম চৌধুরী লন্ডন মাদামতুসে জাদুঘরে
ইয়াকুব আলী চৌধুরী
শাহদাউদ কুরায়শীর একাদশতম বংশধর ইয়াকুব আলী চৌধুরী দাউদপুরের পশ্চিমবাড়ীর অধিবাসী ছিলেন। তিনি প্রথমে কিত্তা পরগণার খ্যাতনামা জমিদার গোলাম হায়দার চৌধুরীর প্রথমা কন্যাকে বিবাহ করেন। গোলাম হায়দার চৌধুরী ছিলেন সুনামগঞ্জের লক্ষনছিরির জমিদার ও বিখ্যাত মরমী কবি হাছন রাজা চৌধুরীর ভগ্নিপতি। ইয়াকুব আলী চৌধুরীর প্রথম স্ত্রীর গর্ভে মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী ও মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরী নামে দুই পুত্র এবং এক মেয়ে আঞ্জুমান আরা জন্মগ্রহণ করেন। আঞ্জুমান আরার বিবাহ হয় ঢাকার বাদামতলীর বিখ্যাত কাজী পরিবারের কাজী শামসুদ্দিনের সঙ্গে। কাজী শামসুদ্দিনের তিন পুত্র ছিলেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র কাজী রিয়াজউদ্দিন উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে ঢাকা পৌরসভার সদস্য ছিলেন। তাঁর নাম অনুসারে ১৮৯৯ ইংরেজী সালে কাজী জিয়াউদ্দীন রোডের নাম রাখা হয়। আঞ্জুমান আরা খাতুনের তৃতীয় পুত্র কাজী আলাউদ্দিনের নামে ১৯৩৬ ইংরেজি সালেই ঢাকার ফুলবাড়ীয়াতে কাজী আলাউদ্দীন রোড নামে আর একটি রাস্থার নামকরণ করা হয়। উল্লেখ্য যে, এই বংশের কাজী জালালউদ্দিন ও তার ভাই কাজী শামসুদ্দীন ১৮৪৮ ইংরেজী সালে বৃহত্তর সিলেটের কটারকুনা থেকে ঢাকার বাদামতলীতে বসতি স্থাপন করেন। এরা ছিলেন ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম শাহ হেলিমউদ্দিন কুরায়শীর বংশধর।
গোলাম হায়দার চৌধুরীর মৃত্যু হলে ইয়াকুব আলী চৌধুরী তাঁর দ্বিতীয় মেয়েকে বিবাহ করেন। উল্লেখ্য যে, গোলাম হায়দার চৌধুরীর এই দুই মেয়ে ছাড়া গোলাম আহমদ চৌধুরী নামে একমাত্র পুত্র ছিলেন। এই পুত্র অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে দুই মেয়ে গোলাম হায়দার চৌধুরীর জমিদারীর উত্তরাধিকারী হন। ইয়াকুব আলী চৌধুরীর দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে মোহতাছিন আলী চৌধুরী নামে এক পুত্রের জন্ম হয় এবং তাঁর জন্মের মাত্র দেড় মাস পর ইয়াকুব আলী চৌধুরীর মৃত্যু হয়। গোলাম হায়দার চৌধুরী অতঃপর তাঁর দ্বিতীয় মেয়েকে রণকেলীর বড়বাড়ির আব্দুল আলীম চৌধুরী ওরফে আকলু মিয়ার নিকট বিবাহ দেন। তাঁর গর্ভে আকলু মিয়ার পুত্র আব্দুল মজিদ চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন।
গোলাম হায়দার চৌধুরী ৮/৩ ছালেহ মোহাম্মদ ও ১০/৫ গোলাম মোহাম্মদ নামে দুইটি বিরাট তালুকের জমিদার ছিলেন। সিলেট সদর থানার মোল্লারগাঁও, বরইকান্দি, তেতলী, টুকেরবাজার ও সালুটিকর ইউনিয়নসমূহ এই তালুক দুইটির অন্তর্গত ছিল। বর্তমান লাক্কাতুড়া ও মালনীছড়া চা বাগান দুইটিও ছিল এই জমিদারীর অন্তর্ভুক্ত। গোলাম হায়দার চৌধুরী অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে তাঁর দুইমেয়ে এই বিরাট জমিদারীর উত্তরাধিকারী হন। তাদের মৃত্যুর পর ইয়াকুব আলী চৌধুরীর তিন পুত্র মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী, মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরী ও মোহতাছিন আলী চৌধুরী এবং মেয়ে আঞ্জুমান খাতুন তাঁদের নানার জমিদারীর প্রায় ১১ আনা অর্থাৎ দুই তৃতীয়াংশের স্বত্ত্বাধিকারী হন। রণকেলীর আব্দুল মজিদ চৌধুরী বাকী ৫ আনা অর্থাৎ প্রায় এক তৃতীয়াংশের মালিক হন।
১.০ মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী
ইয়াকুব আলী চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ হাসান চৌধুরীর এক ছেলে ও এক মেয়ে ছিলেন। একমাত্র পুত্র মোহাম্মদ আলী শৈশবে মাত্র সাত বৎসর বয়সে মারা যান। একমাত্র কন্যা তৈয়বুন্নেছার বিবাহ হয় গহরপুর পরগনার সুলতানপুর গ্রামের জমিদার দেওয়ান আব্দুল গণি চৌধুরীর সঙ্গে। তাঁর গর্ভে জন্ম নেন দেওয়ান আব্দুল রহিম চৌধুরী। ব্রিটিশ আমলে তিনি দীর্ঘদিন সিলেট লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর আপন বোন জিন্নতুন্নেসা খাতুনের বিবাহ হয় আথানগিরীর জমিদার খানসাহেব দেওয়ান আব্দুল মতিন চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহের পরে দুরারোগ্য রোগে ভুগে কয়েক বৎসর পরে মারা যান। তাঁদের বৈমাত্রেয় ভাই দেওয়ান আব্দুর রব চৌধুরীও পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে সিলেট লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান, পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক এসেম্বলির সদস্য ও প্রাদেশিক সরকারের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন। মোহাম্মদ আলীর মৃত্যুতে মোহাম্মদ হাসানের পুরুষ বংশ লোপ পায়।
১.১ আঞ্জুমান আরা
ইয়াকুব আলী চৌধুরীর মেয়ে আঞ্জুমান আরার মেয়ে কলিমুন্নেছার বিবাহ হয় ঢাকা শহরের আরমানীটোলার চৌধুরী গোলাম সাত্তারের সঙ্গে। তাঁদের দুই ছেলে চৌধুরী গোলাম কিবরিয়া ও চৌধুরী গোলাম জব্বার বিয়ে করেন নওয়াব মোশারফ হোসেনের দুই মেয়ে যথাক্রমে ফাতেমা বেগম ও বদরুন্নেছা বেগমকে। উল্লেখ্য, নওয়াব মোশাররফ হোসেন জনাব ই.এ. চৌধুরীর চাচা শ্বশুর।
ইয়াকুব আলী চৌধুরীর ছেলে মোহাম্মদ হাসান চৌধুরীর মেয়ে তৈয়বুন্নেছার ছেলে গহরপুরের দেওয়ান আব্দুর রহিম চৌধুরী। তাঁর দুইমেয়ে ছিল। প্রথম মেয়ে ফাতেহা চৌধুরীকে বিয়ে করেন রণকেলীর ডঃ এস.ডি চৌধুরী, প্রাক্তন ভাইস চ্যান্সেলর ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং দ্বিতীয় মেয়ে সায়েমা চৌধুরীকে বিয়ে করেন বাহাদুরপুরের আব্দুন নূর চৌধুরী। দেওয়ান আব্দুর রহিম চৌধুরীর নামে দেওয়ানগঞ্জে একটি স্কুল ও কলেজ রয়েছে।
২.০ মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরী
ইয়াকুব আলী চৌধুরীর দ্বিতীয় পুত্র মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরী হযরত শাহজালালের(রঃ) সঙ্গীয় অন্যতম আউলিয়া সুলেমান করণী কুরায়শীর বংশধর সিলেটের করণশী পরগণার মতিয়ারগাঁও গ্রামের মনয়ার আলী চৌধুরীর কন্যা হুসনা বানুকে বিয়ে করেন। উল্লেখ্য যে, হযরত সুলেমান করণী কুরায়শীর নাম অনুসারে পরগণাটির করণশী নামকরণ করা হয়। মুনওয়ার আলী চৌধুরীর দুই পুত্র ছিলেন। তাঁদের নাম সুলেমান আলী চৌধুরী ও লোকমান আলী চৌধুরী। মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরীর ঔরসে হুসনা বানুর তিন পুত্র ও এক কন্যার জন্ম হয়। পুত্ররা হলেন (১) কুতুব উদ্দীন আহমদ চৌধুরী, (২) খান বাহাদুর গৌছউদ্দীন আহমদ চৌধুরী ও (৩) কমরউদ্দীন আহমদ চৌধুরী। কন্যার নাম আখতারুন্নেছা। আখতারুন্নেছার বিয়ে হয়েছিল করিমগঞ্জের চাপঘাটের জমিদার আব্দুস সাত্তার চৌধুরীর সাথে। আব্দুস সাত্তার চৌধুরীর ভাই আব্দুল হক চৌধুরীর মেয়েকে বিয়ে করেন ইটার দেওয়ান আব্দুল বাসেত। মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরী মেয়েকে দেখার জন্য চাপঘাট গেলে রোগাক্রান্ত হয়ে হঠাৎ সেখানে ইন্তেকাল করেন। আখতারুন্নেছা নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যাওয়ার পূর্বে তাঁর সম্পত্তি দাউদপুর মসজিদ, মাদ্রাসা ও অন্যান্য দাতব্য কাজে এবং ভাইদের দান করে যান। আবদুল হক চৌধুরীর অপর দুই মেয়েকে বিয়ে করেন চাউতলীর মঈনউদ্দীন চৌধুরী ও ফুলবাড়ীর সালাহউদ্দীন চৌধুরী (মানিক মিয়া)।
২.১ কুতুব উদ্দীন আহমদ চৌধুরী
মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র কুতুব উদ্দীন আহমদ চৌধুরী ছিলেন একজন আদর্শবান ও রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিত্ব। দাউদপুর মাদ্রাসার শিক্ষক মরহুম মৌলবী আব্দুল আজিজের সাথে যৌথভাবে কাদিয়ানী মতবাদ খন্ডন করে তিনি একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। খেলাফত আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় অংশ নেন।
তাঁর প্রথম স্ত্রী দাউদপুরের কুনার বাড়ী নিবাসী আব্দুল জব্বার চৌধুরীর কন্যা নজিবা খাতুনের গর্ভে একছেলে জহির উদ্দিন আহমদ চৌধুরী ও চারমেয়ে ফাতেমা খাতুন, আফিফা খাতুন, মালেকা খাতুন ও ফাহিমা খাতুন জন্মগ্রহণ করেন। ফাহিমা খাতুনের বড় ছেলে ফয়সাল আহমদ চৌধুরী বাংলাদেশ সরকারের পানি সম্পদ বিভাগের সচিব এবং দ্বিতীয় ছেলে সোহেল আহমদ চৌধুরী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
পরবর্তী স্ত্রী দরগামহল্লার মুফতী বশির উদ্দীন আহমদের কন্যা রাবেয়া খাতুনের গর্ভে এক ছেলে রাযী উদ-দীন কুরায়শী ও দুই মেয়ে খোজেস্তা আখতার (হেনা) ও সুরাইয়া খাতুন (হাসনা) জন্ম নেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর পর তৃতীয় স্ত্রী ছাতক থানার পীরপুরের মোঃ মুসলিম চৌধুরীর মেয়ে শুকুরুন্নেছাকে বিবাহ করেন। শুকুরুন্নেছার নামে পীরপুরে একটি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় রয়েছে। তাঁর গর্ভে এক মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। শিশুকালে তাঁর মৃত্যু হয়। ঐ স্ত্রীর পূর্ব-স্বামী আব্দুর রশিদ চৌধুরীর ছেলে মামুনুর রশীদ চৌধুরী।
তৃতীয় স্ত্রী মৃত্যুর পর চতুর্থ ও শেষ স্ত্রী মুফতী নজির উদ্দীন আহমদের মেয়ে আয়েশা খাতুনের গর্ভে এক ছেলে ফকীহ উদ্দীন কুরায়শীর জন্ম হয়। কুতুবউদ্দীন আহমদ চৌধুরীর ছেলেমেয়েদের মধ্যে তিন ছেলে ও দুই মেয়ে বর্তমানে জীবিত আছেন। কুতুবউদ্দীন আহমদ চৌধুরী ১৯৪৪ সালের ২৪শে ফেব্র“য়ারি তারিখে ইন্তেকাল করেন। পশ্চিম দাউদপুর জামে মসজিদ তারই জায়গা তার মেয়ে কর্তৃক প্রদত্ত হয়ে স্থাপিত হয়েছে।
২.১.১ জহির উদ্দীন আহমদ চৌধুরী
কুতুব উদ্দীন আহমদ চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং শাহদাউদ কুরায়শীর পঞ্চদশ বংশধরের বর্তমান জীবিত জ্যেষ্ঠতম নব্বই বছরোর্ধ্ব জহির উদ্দীন আহমদ চৌধুরী গ্রামের বাড়ীতে বিষয় সম্পত্তি দেখাশুনা করেন। তাঁর চার পুত্র (ক) কামাল উদ্দীন আহমদ চৌধুরী (খ) ইমরান উদ্দীন আহমদ চৌধুরী (গ) বোরহান উদ্দীন আহমদ চৌধুরী ও (ঘ) কামরান উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং দুই মেয়ে। জ্যেষ্ঠ পুত্র কামাল উদ্দীন আহমদ সাধারণ বীমা কর্পোরেশনে পদস্থ অফিসার পদে অগ্রিম অবসর নেন। বর্তমানে একটা বেসরকারি বিমা কোম্পানিতে কার্যরত। দুই পুত্র কামরান আহমদ চৌধুরী ও ইমরান আহমদ চৌধুরী ব্রিটেনে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। অন্য ছেলে বোরহান উদ্দীন আহমদ চৌধুরী বাড়িতে থেকে বিষয় সম্পত্তি দেখাশুনায় পিতাকে সাহায্য করেন।
২.১.২ রাযী-উদ-দীন কুরায়শী
কুতুব উদ্দীন আহমদ চৌধুরীর দ্বিতীয় পুত্র রাযী-উদ-দীন কুরায়শী ১৯২৮ সালের ২৯ জানুয়ারী সিলেট শহরের দরগামহল্লায় জন্মগ্রহন করেন। তিনি সিলেট আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন এবং সেখানে তার সহপাঠি বন্ধু ছিলেন প্রয়াত গণনেতা সাংসদ পীর হাবিবুর রহমান। তিনি ১৯৫৩ সালে ঢাকা জগন্নাথ কলেজ থেকে বি.কম. পাস করে ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পি.আই.ডি.সি.র. কর্ণফুলী পেপার মিল অফিসার পদে চাকুরিতে যোগদান করেন। ১৯৫৮ সালে করিমগঞ্জের অন্তর্গত প্রতাপগড়ের সাবেক জমিদার আজফার রাজা চৌধুরীর কণিষ্ঠা কন্যাকে বিয়ে করেন। তিনি বিভিন্ন আধা সরকারি মিল কারখানার হিসাব বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করার পর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ কর্পোরেশনের হেড অফিসে নিরীক্ষাপ্রধান হিসাবে যোগদান করেন এবং ১৯৮৭ সালে চিফ-অডিটর (জি.এম) পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
তিনি ‘রবীন্দ্রনাথের ভক্তিমূলক কবিতা ও গান সংকলন, নামে একটি পুস্তকও প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় তাঁর অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সস্ত্রীক হজ্ব পালন করেন ও বর্তমানে ঢাকার উত্তরায় নিজ বাসভবনে বসবাস করছেন।
রাযী-উদ-দীন কুরায়শী তিন ছেলে ও তিন মেয়ের পিতা। সকলেই বিবাহিত। বড় ছেলে জাকারিয়া আহমদ নিজস্ব ব্যবসায় ও মেজো ছেলে ইফতেখার আহমদ ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো কোম্পানিতে বিদেশে উচ্চ পদে চাকুরি থেকে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি কুয়েতে একটি মালটি ন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করছেন। কনিষ্ঠ ছেলে ইমতিয়ায আহমদ অস্ট্রেলিয়াতে কর্মরত। ছেলে মেয়েরা সবাই সুপ্রতিষ্ঠিত।
২.১.৩ ফকীহ উদ্দীন কুরায়শী
কুতুবউদ্দীন আহমদ চৌধুরীর তৃতীয় পুত্র ফকীহ উদ্দীন আহমদ কুরায়শীর দুই ছেলে। জ্যেষ্ঠ পুত্র সুফিয়ান দেশে বি.কম. পাস করার পর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। কনিষ্ঠ পুত্র সাফফানও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। ফকিহ উদ্দীনও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। তিনি হজরত শাহজালালের(রঃ) দরগার খাদেমমন্ডলীর অন্যতম সদস্য ও সিলেট মুসলিম সাহিত্য সংসদের আজীবন সদস্য।
২.২ খান বাহাদুর গৌছ উদ্দীন আহমদ চৌধুরী (লাল মিয়া)
মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরীর দ্বিতীয় পুত্র খান বাহাদুর গৌছ উদ্দীন আহমদ চৌধুরী ছিলেন এ বংশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। আনুমানিক ১৮৯০ ইংরেজি সালে তাঁর জন্ম হয়। বাল্য জীবনে তিনি গৃহ শিক্ষকের নিকট আরবি, ফার্সি, উর্দু ও বাংলায় শিক্ষা গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, তখনকার দিনে সিলেটের দিনে সিলেটের রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারগুলোতে ইংরেজি শিক্ষা প্রায় নিষিদ্ধ ছিল। এই প্রতিক’লতা সত্ত্বেও ইংরেজি শিক্ষার জন্য তিনি ঢাকা কাজি বাড়িতে তাঁর ফুফুর কাছে থেকে এনট্রেন্স পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঢাকার বিখ্যাত কাজি বাড়ির অভিজাত বংশীয় কাজি আলাউদ্দীন আহমদ, কাজি রিয়াজ উদ্দীন আহমদ এবং কাজি জিয়া উদ্দীন আহমদ তাঁর ফুফাতো ভাই ছিলেন।
খান বাহাদুর গৌছ উদ্দীন আহমদ চৌধুরী একজন নিবেদিত প্রাণ সমাজসেবী ছিলেন। তাঁর কর্মময় জীবনে দীর্ঘ তিন যুগ ধরে তিনি উত্তর সিলেট লোকাল বোর্ডের অত্যন্ত প্রভাবশালী মেম্বার ছিলেন। ১৯৩৭ ইংরেজি সাল থেকে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ সময় পর্যন্ত তিনি তৎকালীন আসাম লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য (এম.এল.সি.) ছিলেন। বহুদিন পর্যন্ত তিনি অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিচার বিভাগীয় জুরি হিসেবে কাজ করেন। তিনি সিলেট জেলের সরকারী পরিদর্শক দলেরও সদস্য ছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টায় দাউদপুর গ্রামে একটি প্রাইমারি স্কুল, দাউদিয়া মাদ্রাসায় মাধ্যমিক ইংরেজি মাদ্রাসা সংযোজন, একটি হাইস্কুল স্থাপিত হয়। দাউদপুর গ্রামে জনসারণের বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন মিটাবার জন্য তিনি উত্তর সিলেট লোকাল বোর্ডকে দিয়ে একটি সরকারি রিজার্ভ পুস্করিনী নির্মাণ করান। সরকারি সাহায্যে দাউদপুর গ্রামে তিনি একটি দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্রও স্থাপন করেন। তাছাড়া তাঁর স্মরণকালের সবচাইতে ভয়ংকর বন্যা হয় যার জন্য এ অঞ্চলে এখনও এই বন্যা ’১৩৩৬ বাংলার বড় পানি’ বলে পরিচিত। এই বন্যায় কুলাউড়া-সিলেট রেল লাইনে অধিকাংশ পানিতে ডুবে যায়, অনেক সেতু ধ্বংস হয় এবং লোকজন অবর্ণনীয় দুদর্শাগ্রস্ত হয়। বন্যাপীড়িত মানুষের সাহায্যে গৌছ উদ্দীন আহমদ চৌধুরী অপরিসীম পরিশ্রম করেন। অভিজাত বংশের সন্তান হয়েও তিনি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের সেবা করে গিয়েছেন। তাঁর জনসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ তদানীন্তন সরকার ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে “খান বাহাদুর” উপাধিতে ভূষিত করেন।
তিনি সিলেট মহকুমা মুসলিম লিগের সভাপতি ছিলেন এবং ১৯৪৭ ইংরেজীর রেফারেন্ডামে যথেষ্ট অবদান রাখেন। মরহুম খান বাহাদুর গৌছউদ্দীন আহমদ চৌধুরী ১৯৫৪ ইংরেজির ৫ই সেপ্টেম্বর তারিখে এক সফল ও গৌরবময় অতীত রেখে পরলোকগমন করেন।
খান বাহাদুর গৌছ উদ্দীন আহমদ চৌধুরী তাঁর চাচা মোহতাছিন আলী চৌধুরীর মেয়ে ছারা খাতুনকে বিবাহ করেন। তাঁদের ঔরসে ছয় ছেলে ও তিন মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ছেলেরা হলেন (১) শামস উদ্দীন আহমদ চৌধুরী, (২) নূর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী, (৩) ইমাদ উদ্দীন আহমদ চৌধুরী, (৪) ইমাম উদ্দীন আহমদ চৌধুরী, (৫) নাসির উদ্দীন আহমদ চৌধুরী ও (৬) শফি উদ্দীন আহমদ চৌধুরী। মেয়েরা হলেন- সাজেদা খাতুন চৌধুরী, আশরাফুন্নেছা খাতুন চৌধুরী ও সুফিয়া খাতুন চৌধুরী। গহরপুর পরগণাস্থ সুলতানপুর গ্রামের মরহুম মৌলানা লুৎফুল হক চৌধুরীর সাথে তাঁর জ্যেষ্ঠ মেয়ে সাজেদা খাতুনের বিবাহ হয়। লুৎফুল হক চৌধুরী ছিলেন সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল। মেজো মেয়ে মরহুমা আশরাফুন্নেছার স্বামী মরহুম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বাড়ি মৌলভীবাজারের দুর্লভপুর গ্রামে। মৌলভীবাজার সরকারি হাই স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে থাকা কালে তিনি সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তৃতীয় মেয়ে মরহুমা সুফিয়া খাতুনের স্বামী মরহুম আব্দুল মুনিম চৌধুরী ব্রিটিশ আমলের জেলা প্রশাসক কানিহাটির মরহুম খান বাহাদুর তজম্মুল আলী চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ ছেলে। মেজো মেয়ে আশরাফুন্নেছা পরলোকগমন করেন ২১শে সেপ্টেম্বর ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে এবং কনিষ্ঠা মেয়ে সুফিয়া খাতুন ১৯ জুলাই ২০০৭ ইংরেজি ইন্তেকাল করেন।
খান বাহাদুর গৌছউদ্দীন আহমদ চৌধুরী স্ত্রী ছারা খাতুন ছিলেন এক রত্মগর্ভা মহিয়ষী মহিলা। সিলেট রত্ম ফাউন্ডেশন তাঁকে মরণোত্তর রত্মগর্ভা মা এওয়ার্ড ২০০৯ প্রদান করে। তাঁর ছয় পুত্রই উচ্চ শিক্ষা লাভ করে কর্মজীবনে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাঁদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে দেয়া গেলঃ
২.২.১ শামস উদ্দীন আহমদ চৌধুরী
খান বাহাদুর গৌছ উদ্দীন আহমদ চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র শামস উদ্দীন আহমদ চৌধুরী ১৯৩৭ ইংরেজিতে সিলেট সরকারি উচ্চ ইংরেজি স্কুল থেকে মেট্রিক, এম.সি. কলেজ থেকে আই.এ. ও ১৯৪১ ইংরেজিতে এম.সি. কলেজ থেকে বি.এ. পাস করেন। প্রথম জীবনে আসামের শিলচর ও পরে করিমগঞ্জ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি সহকারী স্কুল পরিদর্শক পদে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি আসামের খাদ্য বিভাগে ইন্সপেক্টর পদে নিযুক্ত হন। পূর্ব পাকিস্তানে এই পদে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কর্মরত থাকার পর তাঁকে রাজস্ব বিভাগে অডিটর পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়। একই বিভাগে সুপারিনটেনডেন্ট অব রেভিনিউ (একাউন্টস) পদে উন্নীত হয়ে ১৯৭৭ সালে তিনি সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, অমায়িক ও পরোপকারী। তাঁর বাসা হাউজিং এস্টেটের প্রবেশ পথে সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে রয়েছে।
শামস উদ্দীন আহমদ চৌধুরী লংলা পরগণার অন্তর্গত আমানিপুর গ্রামের জমিদার সৈয়দ আফতাব উদ্দীন হোসেনের দ্বিতীয় কন্যা মরহুমা সৈয়দা বদরুন্নেছা খাতুনকে বিবাহ করেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে সৈয়দ আফতাব উদ্দীন হোসেনের প্রথম কন্যার বিবাহ হয় হযরত শাহজালালের দরগার মোতওয়াল্লি মরহুম আবুজাফর আব্দুল্লাহ এর সাথে। শামসউদ্দীন চৌধুরীর স্ত্রী সৈয়দা বদরুন্নেসার ইন্তেকাল হয় ১০ই জুলাই ২০০৭ ইংরেজিতে।
শামসউদ্দীন আহমদ চৌধুরী দুই পুত্র, প্রথম পুত্র নিজামউদ্দীন আহমদ চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক(অনার্স) ডিগ্রি নিয়ে ব্রিটেনের লুটন শহরে একটি ঔষধ কোম্পানিতে কেমিস্ট পদে চাকুরি করেন। নিজামউদ্দীন আহমদ চৌধুরী ফেঞ্চুগঞ্জের সুলতানপুর গ্রাম নিবাসী এবং বর্তমানে ব্রিটেনের লোটন শহরে স্থায়ীভাবে বসবাসরত সানওয়ার আলীর মেয়েকে বিবাহ করেন। তাঁর দুইছেলে ও একমেয়ে। শামসউদ্দীন আহমদ চৌধুরীর দ্বিতীয় পুত্র হুসামউদ্দীন আহমদ চৌধুরী সিলেট শহরে আম্বরখানাস্থ নিজ বাড়ীতে থেকে বিষয়সম্পত্তি দেখাশুনা করেন। সিলেটের কুলাউড়া নিবাসী মরহুম আইনউদ্দীন চৌধুরীর মেয়ের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। মরহুম শামসউদ্দীন আহমদ চৌধুরীর চার মেয়ে- নার্গিস আনোয়ারা, ফাওজিয়া সুলতানা চৌধুরী, রাফিয়া খাতুন ও নাজমা খাতুন। প্রথম জামাতা সৈয়দ মহিউদ্দীন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য পদ থেকে অবসর গ্রহণ করে মারা যান। দ্বিতীয় জামাতা শফিকুর রহমান চৌধুরী ব্রিটেনে ও ঢাকা শহরে আধুনিক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সুপ্রতিষ্ঠিত। তৃতীয় জামাতা দেওয়ান আব্দুর রকিব চৌধুরী চট্টগ্রাম ইস্টার্ন রিফাইনারীতে মহাব্যবস্থাপক পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। কনিষ্ঠ জামাতা নিয়াজ আহমদ চৌধুরী চট্টগ্রাম শহরে ব্যবসা করেন। ১৯৯৭ ইংরেজীর ২৫মে তারিখে শামসউদ্দীন আহমদ চৌধুরী সিলেটে ইন্তেকাল করেন। তাঁকে শাহজালালের দরগায় দাফন করা হয়।
২.২.২ নূর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী
খান বাহাদুর গৌছ উদ্দীন আহমদ চৌধুরীর দ্বিতীয় পুত্র নূর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী সিলেট সরকারি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে ১৯৩৮ ইংরেজি সালে মেট্রিক, সিলেট এম.সি কলেজ থেকে ১৯৪০ইং সালে আই.এস.সি এবং ১৯৪২ সালে কৃতিত্বের সাথে ডিগ্রি পাস করেন। শিক্ষা সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তিনি আসাম সিভিল ডিফিন্সের এ.আর.পি অফিসার হিসেবে কর্মজীবন আরম্ভ করেন। সে সময় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছিল। যুদ্ধ শেষে আসাম সরকার পি.এস.সি-র সুপারিশে তাঁকে খাদ্য বিভাগে কন্টোলার অব সাপ্লাই পদে নিয়োগ প্রদান করেন। দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্থানে একই বিভাগে দীর্ঘকাল অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে খাদ্য বিভাগের মহাপরিচালক পদে উন্নীত হন। এবং বিশেষ সুনামের সাথে এ দায়িত্ব পালন করে ১৯৮০ ইং সালে চাকুরি জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অতিথিপরায়ণ ও পরোপকারী হিসেবে তিনি বিশেষভাবে প্রশংসার পাত্র ছিলেন। তিনি তাঁর কনিষ্ঠ সব ভাইদের উচ্চ শিক্ষায় বিশেষ অবদান রাখেন।
১৯৪৭ইং সালে ৬ই মার্চ তিনি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থানার সুনাইথা গ্রামের জমিদার প্রাক্তন এক্সাইজ কমিশনার মরহুম খান বাহাদুর আব্দুল হাই চৌধুরীর মেয়ে জেবুন্নেসাকে বিবাহ করেন। তাঁদের ঔরসে পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে জন্মগ্রহণ করে। মেয়েরা হলেন- সাবেরা চৌধুরী (ফাত্তলা), ফায়েকা চৌধুরী, শায়েলা চৌধুরী, রুবিনা চৌধুরী ও ফারহানা চৌধুরী। তাঁর একমাত্র পুত্র মিনহাজ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী।
১৯৯১ইং সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর তারিখে নূর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী ইন্তেকাল করেন।
২.২.২.১ মিনহাজ উদ্দীন আহমদ চৌধুরী
নূর উদ্দীন আহমদ চৌধুরীর একমাত্র ছেলে মিনহাজ উদ্দীন আহমদ চৌধুরী ১৯৬১ সালের ৩১ জানুয়ারি দাউদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বি কম অনার্স এবং এম কম ডিগ্রি লাভ করেন। পরে কয়েক বৎসর ‘ব্রেক’ এ রপ্তানী ব্যবস্থাপক পদে চাকুরি করেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়া সরকারের ট্রেড কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকাস্থ অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনে চাকুরিরত আছেন। সুদীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য সহ অনেক দেশ সফর করেন। তার সহধর্মিনী আদিলা চৌধুরী। তাঁদের ছেলে ইফাজ আহমদ চৌধুরী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির রাটগার্ড ইউনিভার্সিটিতে বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন পড়াশুনা করছে। মিনহাজ চৌধুরী গ্রীনডেল্টা ইন্সুরেন্স কোম্পানির একজন পরিচালক ছিলেন।
২.২.২.২ নুরউদ্দিন আহমদ চৌধুরীর মেয়েরা
প্রথম মেয়ে সাবেরা চৌধুরী স্বামী সদরুল ইসলাম চৌধুরী বাটা সু কোম্পানির প্রডাকশন ম্যানেজার পদ থেকে অবসর নিয়ে পরে ‘দোয়েল’ গ্র”পের জেনারেল ম্যানেজার পদে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি ওয়াশিংটনে আছেন। দ্বিতীয় মেয়ের স্বামী আনহার আহমদ চৌধুরী ব্যবসায় রত আছেন। শায়েলা চৌধুরী স্বামী সৈয়দ মোহাম্মদ সৈফুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের নিউর্জাসিতে কাজ করছেন। চতুর্থ মেয়ের স্বামী জাহেদ ইকবাল যুক্তরাষ্ট্রের নদার্ণ আইওয়া ইউনিভারসিটির এসিস্টেন্ড প্রফেসর পদে কর্মরত রয়েছেন। কনিষ্ঠ মেয়ের স্বামী ফুজাইল আলম ইনল্যান্ড অয়েল ট্যাংকার ব্যবসা পরিচালনা করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে থাকেন। সাবেরা চৌধুরীর মেয়ে নাদীয়া আফরীন ওয়াশিংটনে ডেভেলাপমেন্ট গেটওয়ে ফাউন্ডেশনে উচ্চ পদে কর্মরত।
২.২.২ ইমাদ উদ্দীন আহমদ চৌধুরী (ই.এ চৌধুরী)
খান বাহাদুর গৌছউদ্দীন আহমদ চৌধুরীর তৃতীয় পুত্র ইমাদউদ্দীন আহমদ চৌধুরী সর্বসাধারণের নিকট ই.এ.চৌধুরী নামে সমধিক পরিচিত। গ্রামের দাউদিয়া এম.ই.স্কুল থেকে ফাইনাল পরীক্ষায় পাস করে তিনি সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৪৩ সালে মেট্রিক পাস করেন। পরবর্তীতে সরকারি মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে ১৯৪৫ সালে আই.এ. এবং ১৯৪৮ সালে ইতিহাসে বি.এ. অনার্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবনে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। স্কুলে পাঠ্যাবস্থায় ১৯৪২ সালে তিনি ‘সবুজ পতাকা’ নামে ছাপার অক্ষরে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকায় ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের তৎকালীন অবিসংবাদিত নেতা কায়েদ-এ-আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর একটি বাণী প্রকাশিত হয়। তাছাড়া তিনি ‘পরীস্থান’ নামে একটি হস্থলিখিত পত্রিকার সম্পাদনা করেন। ১৯৪৩ সালে তিনি সিলেট সরকারি হাই স্কুল ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৪৯ সালে তিনি ও আব্দুল মুন্তাকিম চৌধুরীর যৌথ সম্পাদনায় ‘পাকিস্তান ইয়াবুক, ১৯৪৯’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ফেনী কলেজের প্রভাষক হিসাবে ই.এ. চৌধুরী কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে অনুষ্ঠিত তদানীন্তন “পাকিস্তান সুপিরিয়র সার্ভিস” পরীক্ষা পাশ করে ১৯৫৪ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি এসিস্টেন্ট পুলিশ সুপারিন্টেডেন্ট পদে “পাকিস্তান পুলিশ সার্ভিসে” নিযুক্তি লাভ করেন। পুলিশ বিভাগে বিশেষ কৃতিত্বের সাথে এক এক করে সাফল্যের সব কয়টি সোপান অতিক্রম করার পর ১৯৮৪ সালের ১লা জানুয়ারি মাসে তিনি বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল পদে অধিষ্ঠিত হন এবং ১৯৮৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর মাসের শেষ দিনে সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ঢাকার সিটি এস.পি. পদে থাকাকালে ১৯৬৪ সালে অসীম সাহসিকতার জন্য তিনি পাকিস্তান পুলিশ মেডেলে ভূষিত হন। ১৯৭৬ সালে তাঁর নেতৃত্বে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠিত হয় এবং তিনি এর প্রথম কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন।
“সবুজ পতাকা” পত্রিকা প্রকাশনা উপলক্ষ্যে সম্পাদক ই.এ. চৌধুরীর নিকট কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রেরিত বাণী।
ই.এ. চৌধুরী সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণের পরও সমান উদ্যম নিয়ে বিভিন্ন কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। ১৯৮৬ সালে তিনি পূবালী ব্যাংক পিএলসির পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন এবং প্রায় দুইযুগ এই পদে নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়া তিনি ঢাকা শহরে বসবাসরত বৃহত্তর সিলেটবাসীদের জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সভাপতি পদে অনেক বছর অধিষ্ঠিত ছিলেন। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা কাওরান বাজারে সিলেট বিভাগবাসীদের সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে নির্মিত বহুতলবিশিষ্ট ‘জালালাবাদভবন’ তাঁর একনিষ্ঠ প্রচেষ্টার ফসল। তাছাড়া ই.এ. চৌধুরী সিলেট এবং ঢাকার বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণ মূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি জালালাবাদ ভবন ট্রাস্ট, মুহিবউদ্দিন আহমদ শিক্ষা ট্রাস্ট ও আফতাব জাহান কল্যাণ ট্রাষ্টের চেয়ারম্যান ছিলেন। তাছাড়া তিনি ন্যাশনাল হার্ড ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এর কোষাধ্যক্ষ ও বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার্স কল্যাণ সমিতির সহ-সভাপতি পদে দায়িত্বপালন করে এসেছেন। সিলেট লায়ন্স ক্লাব শিশু হাসপাতালের তিনি একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
কুমিল্লার চিওড়া কাজিবাড়ির খান বাহাদুর মোখলেছুর রহমানের কন্যা কানিজ মোমেনার সাথে ১৯৫৬ সালে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁর শ্বশুর একজন খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ ও চা বাগানের মালিক ছিলেন। সিলেট ও জলপাইগুড়িতে তাঁর মালিকানাধীন অনেকগুলো চা বাগান ছিল। জলপাইগুড়ির নওয়াব মোশাররফ হোসেন ছিলেন তাঁর আপন বড় ভাই।
দুই পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের জনক ই. এ চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র এজাজ আহমদ চৌধুরী আমেরিকা থেকে এম.বি.এ. পাশ করে দেশে ফিরে আসার পর সিলেট বিসিক শিল্প নাগরীতে ২টি বস্ত্র মিল প্রতিষ্ঠা করেন। মিলগুলো পুরোপুরি চালু হওয়ার আগেই এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯৮৫ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে অবিবাহিত অবস্থায় এজাজ আহমদ চৌধুরী ইন্তেকাল করেন।
ছবিঃ ইসফাক কুরেশী, রিয়াজ এ চৌধুরী ও চেয়ারম্যান নুরুল আলম
কনিষ্ঠ পুত্র রিয়াজ আহমদ চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.কম এবং পরবর্তীতে এম.বি.এ পাশ করেন। বর্তমানে তিনি এইচ.এস. বি.সি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পদে নিযুক্ত আছেন।
ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভাইস চ্যান্সেলার ডঃ বজলুল মোবিন চৌধুরীর কন্যা অদিতি চৌধুরী তাঁর সহধর্মিনী। দুইপুত্র আবরাজ আহমদ চৌধুরী ও সাফরাজ আহমদ চৌধুরী। ডঃ বজলুল মোবিন চৌধুরীর বাড়ি সিলেটের ভাদেশ্বর এবং তিনি প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র সচিব শমশের মোবিন চৌধুরীর ভাই।
মিসেস রুমানা শরীফ
ই. এ চৌধুরী ২০০৯ সালের ২৮ জানুয়ারি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। হজরত শাহজালালের দরগার ভিতরের ইবাদাতখানার ঠিক পশ্চিমে টিলার উপর তাঁকে চিরশায়িত করা হয়। “এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাই তুমি করে গেলে দান।” তার সুযোগ্যা সহধর্মিণী কানিজ মোমেনা চৌধুরী ২০১৬ সালের ১৫ জুন ইন্তেকাল করলে তার পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। ই এ চৌধুরীর স্মরণে জালালাবাদ এসোসিয়েশন ঢাকা, কাওরানবাজারে জালালাবাদ এসোসিয়েশন ভবনে তাঁদের কনভেনশন সেন্টারের নামকরণ করেন 'ই এ চৌধুরী হল'।
তাঁর নামে সিলেটের দাউদপুরে ই এ চৌধুরী টেকনিক্যাল কলেজ স্থাপিত হয়েছে। জাপান-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব স্কুলের পাঠাগার ও দাউদপুর মাদ্রাসার একটি ভবনের নামকরণ তাঁর সম্মানে তারি নামে রাখা হয়েছে।
ই এ চৌধুরীকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন। আমিন।
২ ২ ২ ১ এজাজ আহমদ চৌধুরী



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন