বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৬

হে রক্তাক্ত নক্ষত্র


চিত্রঃ শহিদ শামসুদ্দোহা চৌধুরী (বামে)। জন্ম ১৯৩৬ সালে সিলেটের দক্ষিণসুরমা উপজেলার রেঙ্গা দাউদপুর গ্রামে।  পাকসেনাদের বিরূদ্ধে বিদ্রোহ করে ময়নামতি সেনানিবাসে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনাকালে মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে আর অনেক দেশপ্রেমিক বাঙ্গালি 
সেনাদের সাথে জীবন উৎসর্গ করেন। 

হে রক্তাক্ত নক্ষত্র
(আমার আপন চাচাতো ভাই একাত্তুরের বীর শহিদ শামসুদ্দোহা চৌধুরী ও স্বাধীনতা যুদ্ধের তিরিশ লক্ষ শহিদ স্মরণে)
যুগে যুগে পৃথিবীর ইতিহাসের ভিত ধরে,
নাড়া দিতে গিয়ে, দিলো যারা প্রাণ।
তুমি তাহাদের দলে, হে দুর্দান্ত সৈনিক,
মহাকালের বুকে তুমি চির অম্লান।
স্বদেশের অন্ধাকাশে রবির উদয় ঘটাতে,
সবযুগে দুনিয়ায়, সপিল যারা প্রাণ।
চঞ্চল আমার চোখ, পান্ডুর ইতিহাসে,
লিখা দেখে তাহাদের নাম।
হে অমর, পৃথিবীর সুবিস্তৃত ইতিহাস ধারায়,
বাংলার তিরিশ লক্ষ শহিদের এক স্থূপীকৃত লাশে।
থামিবে এসে যুগে যুগে শতশত মানুষের চোখে,
দেখিবে তোমাকে এক লালফুল, রক্তাক্ত লুটেছো ঘাসে।
রক্তমাখা সাথীদের সাথে তোমার সূর্যলাল নাম,
যুগে যুগে বাংলার মানুষ নত হয়ে করিবে সম্মান।
কি দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবো তোমাকে, কি আছে দিবার মোদের,
তুমি গৌরব বাংলার, তুমি গৌরব আমাদের।
আমি মরে গেলে সব হবে শেষ থাকিবে না স্মৃতি আর,
কিন্তু তুমি চেতনার ধারালো এক অগ্নি তরবার।
যুগে যুগে তোমার আত্মা প্রয়োজনে আসিবে বাংলায়,
চেতনার আগুন জ্বালিয়ে দিবে সংগ্রামীদের গায়।
হে শুকতারা, মিটিমিটি জ্বলিবে তুমি,
চিরদিন বাংলার আকাশে।
সন্ধানী দেখিবে চেয়ে অন্ধকার রাতে,
পথভূলা মাঝি তাকাবে একবার ঠিকানার আশে।
সব পথহারা কালোরাতে দেখিবে আপন পথ,
তুমি ধ্রুবতারা বাংলার” -সবার অভিমত।
যুগান্তরের লৌহ প্রাচীর উপড়াতে গিয়ে,
হিংস্র ঘাতকের উন্মুক্ত থাবায়।
শরীরের কংকাল হাতিয়ার করে,
এভারেষ্টের শিরতুলে যে বীর দাঁড়ায়।

বক্ষ উম্মুক্ত করে বাতাসে মেলে ধরে প্রাণ,
ক্ষুধার্ত নেকড়ের সম্মুখে।
রিক্ত হাতে চামড়াকে ঢাল করে,
জীবনটাকে বাজী রেখে শত্রুকে যারা রুখে।

ঘাতকের থাবার সম্মুখে প্রশান্ত চিত্তে,
মেলে দেয় হাসিমুখে যারা নিজ বুক।
তাদের মৃত্যু নেই, তারা মৃত্যুঞ্জয়ী, তারা অমর,
তাদের লালনাম স্মৃতিতে রাখিবে লোক।
১০
অস্ত্র জমা দিবনা হারামজাদাদিয়েছিলে চীৎকার,
ময়নামতির ঐতিহাসিক উষ্ণ চত্বরে।
কেঁপে উঠেছিল মাটি, সেনাঘাটি, সৈনিক রক্ত,
তোমার সুতীব্র হুংকারে।
১১
বলেছিলে- আমার রক্তে স্বাধীনতা আনিবো,
যুগে যুগে পরাধীন বাংলার,
আমি সৈনিক, আমি যোদ্ধা, আমি মেশিনগান,
আমি বঙ্গপোসাগরের উত্তাল ঢেউ,
আমি দুর্বার।
১২
তোমার প্রদীপ্ত কণ্ঠের ডাকে,
বাঙ্গালি সেনাদের রক্ত হল লাল।
মৃত্যুর সামনে ধরিলে সদম্ভে,
বাংলাদেশের স্বাধীনতার হাল।
জীবনের বুকে দিয়ে পদাঘাত,
হলো সব মৃত্যুর মুখোমুখী।
বিদ্রোহী হয়ে দাঁড়ালো সবাই,
হিংস্র শিকারী হায়েনার পথরুখী।
১৩
নির্ভীক, এগিয়ে গেলে মেশিনগান হাতে,
তাকালেনা পশ্চাতে আছে কি না কেউ সাথে,
আগুনে ধাবমান পতঙ্গের মত,
আপনাকে দিলে তুমি বুকপাতে।
১৪
নির্ভীক দিলে বুক, উন্মুক্ত কামানের সম্মুখে,
মৃত্যুকে জড়ায়ে দুহাতে শত্রুকে দাড়ালে রুখে।
মৃত্যু মিথ্যা নয়, ইতিহাস বলে যায়,
ইতিহাস শতসহস্র শহিদের গাঁথা লিখে যায়।
তুমিও ওদের একজন, তুমিও ইতিহাস,
তোমার খুনের দাগ, ইতিহাসে কোনদিন হবেনা বিনাশ।
১৫
তোমার রক্তে অনাগত কালে জ্বালাবে মানবমন,
তোমার রক্তে জাগিবে মানুষ, জাগিবে সবুজ বন।
তোমার রক্তে জাগবে ঘুমন্ত, খুঁজবে আপন পথ,
তোমার রক্তে মুক্তির সৈনিক, আরোহিবে লালরথ।
১৬
তোমার রক্তে মরবে ঘাতক, যে আঘাত হানবে বাংলায়,
তোমার রক্তে শিকল পরা মানুষের, মুক্তির গান শুনা যায়।
তোমার রক্ত সফল কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে,
রক্ত লাল হয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যাকাশে ভাসে।
১৭
তুমি চলে গেছ আমাদেরে ছেড়ে,
চলে গেছ সুন্দর পৃথিবীর আকাশ বাতাস ফেলে।
চলে গেছ সাজানো সংসার, পুত্র কন্যা ফেলে,
জীবনের স্বপ্ন আশা, ভালবাসা মাটিতে ঢেলে।
কেবল বাংলার নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়,
সব ফেলে একেবারে উদম খালিগায়।
জগতের রূপসুধা, সুরগান রণিবেনা কোনদিন আর,
তোমার কর্ণকুহরে কিংবা মোহময়ী নয়নে আবার।
১৮
হে সূর্য, হে প্রদীপ্ত সূর্য
যদি আমি তোমার নামটি ধরে চীৎকার করি,
ময়নামতির আনাচে কানাচে, রাস্থায় রাস্থায়,
তুমি কি তাহলে ফিরে আসিবে আবার?
আমার ডাকে ঘুম তোমার ভাঙ্গিবে কি আর?
জানি আমি, আমার চীৎকার প্রতিধ্বনী হবে,
আঘাত হানিবে,
দেয়ালে দেয়ালে পাহাড়ের গায়।
এই অস্থির ডাক লুফে নিবে,
চারপাশে বহমান বাতাস,
তবু তুমি আসিবেনা জানি কোনদিন।
তুমি আর আসিবেনা ফিরে,
তুমি আর আসিবেনা বীর,
তুমি আর আসিবেনা আমাদের মাঝে।
১৯
তোমার রক্তমাখা, লাশের সন্ধান,
মিলে নাই, মিলবে না, জানি আর।
গুলীতে ঝাঝরা হয়েছে, কিংবা বোমায় পুড়ে ছাই,
সব অর্ঘ্য করেছ চরণে বাংলার।
হয়তো কোন অজানা কবরে ঘুমিয়ে রয়েছ,
অজস্র সাথী নিয়া।
কিংবা চীলশকুনেরা নিঃশঙ্কায়, টুকরো, টুকরো
খেয়েছে গিলিয়া।
তোমার লাশের যাই হোক,
তুমি জীবন্ত রয়েছো পড়ে,
কোটি কোটি মানুষের হৃদয় কবরে।
তুমি শহিদ, তোমার সতরূন লাশ গলিবেনা কোনদিন,
তোমার রক্তমাখা তরতাজা লাশ, মানুষ দেখিবে সবদিন।
২০
বিচারের দিন দাঁড়াবে তুমি রক্তমাখা গায়,
এই রক্তই সাক্ষী হবে, খোদার বিচার সভায়।
এই রক্ত সাক্ষ্য দিবে, তুমি সত্যের সৈনিক,
হায়েনা ঘাতক দলে, জানাবে হাজার ধিক্।
২১
ধন্য হয়েছে তোমার মৃত্যু, ধন্য তোমার সব,
রক্তে তোমারস্বাধীন বাংলাগর্জে ছিল রব।
তোমার রক্তে ফলেছে বৃক্ষ, হয়েছে বাংলাদেশ,
রক্তে তোমার অমর চেতনা, কখনো হবে না শেষ।
২২
তোমার জানাজা হবেনা, জানি জগতে কোনদিন আর,
সবার অলক্ষ্যে কিন্তু জানাজা হয়েছে তোমার।
শরিক হয়েছে, বাংলার আকাশ, বাতাস, মাটি,
তোমার রক্ত হয়েছে বাংলার, মুক্তিযুদ্ধের ঘাটি।
২৩
অন্তরালে, তোমার লাশ নিয়ে হয়েছে মিছিল,
চারপাশে ছিল যখন, উদ্যত, নেকড়ে, চিল।
এ লাশ মরতে দেবনা, গলতে দেবনা, আমরা কোনদিন,
তোমার লাশের শত্রুদের চিরদিন, করিবো নিশ্চিন।

কবি লেখক ব্লগার ও পূবালী ব্যাংকার ইসফাক কুরেশী   
রচনাকালঃ ২০ মার্চ ১৯৮৫ সাল
রচনাস্থানঃ রেঙ্গা দাউদপুর, পূর্ব চৌধুরীবাড়ি, দক্ষিণসুরমা, সিলেট।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন