শিমি চৌধুরী তুমি,
সেই শিমি চৌধুরী।
যাকে নিয়ে হারিয়ে যেতাম
সন্ধ্যার অন্ধকারে
গাঁয়ের নির্জন বাংলায়।
দিবসের নীরবতা, রাতের আবছা আলো,
নাম ধরে ডাকতো শুধু তোমায় আমায়।
এই লোমশ বুকে সলজ্জ্ব মাথা রেখে তুমি
সেই পুরনো বাড়ির নির্জন প্রকোষ্টে
আধো আধো অন্ধকারে
জলভেজা আঁখি মেলে
কানে কানে সুধাতে আমায়,
“বলো, করবে কি তুমি, আমি যদি মরে যাই?”
সব কথা থেমে যেত কন্ঠে আমার,
মনে মনে হাসতাম, নিরিবিলি ভাবতাম।
“এ কোন অবুঝ মেয়ের পাল্লায় পড়েছি আমি”
চোখ বুজে যেত মোর, তোমার হেয়ালিপনা দেখে।
মাঝে মাঝে বলতাম-
“তুমি তো আর ছোট্ট খুকি নও শিমি,
এত মেয়েলিপনা যে আর, ভাল লাগে না আমার।”
তুমিতো সেই শিমি চৌধুরী-
যে আমাকে হাজার প্রশ্নবানে করতে অস্থির।
বলতে বারবার-
“বলো না, বলো না তুমি,
করবে কি তুমি, আমি যদি মারা যাই?”
আমি ঠাট্টা করে অনুস্বরে বলতাম-
“তুমি চলে গেলে এই দুনিয়ায় শিমি রয়েছে হাজার,
ওদের বক্ষে খুঁজবো মধু, বাঁধবো সোনার সংসার।”
আমার সপ্রতীভ উচ্চারণে,
বর্ষার ঘনকালো মেঘের মত।
জমাটবদ্ধ হয়ে যেত তোমার গোলাপী মুখ।
বৃষ্টিময় আঁখি দু’টি মেলে,
তাকাতে আমার দিকে,
বড় সকরুণ চেহারায়।
কয়েক ফোঁটা লবনাক্ত জল মাটিতে ফেলে
শ্বাসরুদ্ধ কন্ঠে বলতে আমায়-
“তুমি বড়ই ভয়ানক, বড়ই নিষ্ঠুর
তুমি আমায় একবিন্দুও ভালবাস না,
অথচ ভালবাসার অভিনয় কর সারাদিন।
এত করেও তোমাকে আমি
বুঝতে পারিনি, জানতে পারিনি,
চিনতে পারিনি, এতদিন।
তুমি লোহার মত শক্ত পুরুষ
তোমার মন জয় বুঝি আর, হবে না আমার।”
এমনি হাজার কথায় আমাকে
ভাবনার আগুনে পুড়িয়ে,
কথার অত্যাচারে ডুবিয়ে,
বিষবাষ্পে কাঁদিয়ে কাঁদিয়ে,
কী বলে হাসি ফুটাতাম তোমার রাঙ্গা দুটি ঠোঁটে,
তা কি তুমি ভুলে গেছ শিমি,
বলো তুমি কেমন করে ভুলে গেলে, এত তাড়াতাড়ি।
আমি মাটিতে হাত রেখে করতাম শপথ,
মহান স্রষ্টার দোহাই দিতাম বারবার।
সাক্ষী রাখতাম আকাশ বাতাস
সাক্ষী রাখতাম পূণভূমি জন্মস্থানকে।
হাজার সাক্ষ্য সবার অলক্ষ্যে রেখে
উদাত্ত কণ্ঠে বলতাম-
বিশ্বব্রাম্মাণ্ড জুড়ে আমার হৃদয় বিস্তৃত
এই হৃদয়ের সর্বত্র বিস্তৃত একটি নাম শিমি।”
বলতাম কানে কানে-
“তোমায় আমি ভালবাসি শিমি,
এতটুকু শঠতায় এত বৃষ্টি ঝরালে যে তুমি!
তোমার নয়নের মেঘে ভিজে ভিজে,
ভয়ানক কালাজ্বর কিংবা ম্যালেরিয়া হয়ে,
আমি যদি মারা যাই,
করবে কী তুমি?”
সযত্নে বলতে তখন-
“তোমার বিরহে আমি কাঁদবো জীবনভর,
কেঁদে কেঁদে একদিন শেষ করে দেবো আয়ু,
সবশেষে চলে যাবো আমি তোমার কাছে,
তোমারই ঠিকানায়।
যতদিন বেঁচে রবো, দেখবনা আর কোন পুরুষের মুখ।”
মৃদু হেসে বলতাম-
“আমি কেন? আমার মত শতশত পিপাসার্থ জন,
মধুর খুঁজে করছে ভ্রমণ,
তুমি কি পারবে ঠেকাতে তাদেরে,
অবলার বল দিয়ে?
প্রকৃতি কিছুই শূন্য রাখেনা,
আমি চলে গেলে আমার শূন্যতা,
অন্য কেউ এসে করবে পূরণ।
সেইদিন ভুলে যাবে কৈশোরের স্মৃতি
ফ্রক পরা চিরতরে হয়ে যাবে ইতি।
স্মৃতিলোকে উদিবেনা আর কোনদিন,
এই উচ্ছল ছেলেটির মুখ।
তবুও কিছুটা পড়বে মনে,
ওহ, দেখা হত দুষ্ট এক তরুণের সনে,
সরকারী কলেজে চোখে চোখ রেখে সে হাসতো
একা পেলে আড্ডা দিত, হৃদয় মিলাতো,
কুকড়ানো চুল ছিল, শ্বেতশুভ্র রঙ্গ ছিল,
হাসিমাখা মুখে ছিল, বিষন্ন দুই চোখ।
সে তো মরে গেছে সেই কোনদিন,
হয়তোবা পঁচে গেছে, গলে গেছে,
আত্মা তাঁর হয়ে গেছে ভূত।
কবরের অন্ধকারে মাটি খেয়েছে তাঁরে,
সেই কোনকাল।
সেই কোনকাল।
ঠিক মনে পড়ছেনা, যাহ যত সব জজ্ঞাল।
ওর কথা ভেবে ভেবে লাভ কি বা আর,
আচমকা শিহরিত হবে তুমি,
ওর প্রেতাত্মা যদি ভর করে আবার,
ভয়ে ভয়ে মন হতে মুছে দিবে নামটি আমার।
এমনি করে করে একদিন হেরে যাব চিরতরে,
তুমি আর কোনদিন খুঁজবেনা এই অভাগারে।
রচনাকালঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবন

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন