শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

চাকুরির সুবাদে সিলেটের প্রান্তরে প্রান্তরেঃ

 

চাকুরির সুবাদে সিলেটের প্রান্তরে প্রান্তরেঃ

রা ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সাল। তখন ছিল পবিত্র রমজান মাস। ইতিমধ্যে পাগলাবাজার শাখা হতে সুনামগঞ্জ সিদ্দরপাশার অভিজাত পরিবারের সন্তান জিয়াউল হক চৌধুরী বদলি হয়ে সুনামগঞ্জ শাখায় চলে যান। নুতন ব্যবস্থাপক অভিজিত চৌধুরী যোগদান করেই জরুরী ছুটি নেন। তখন রমজান মাস, ফরজ রোজা রেখেই আম্বরখানা গিয়ে সুনাগঞ্জের বাস ধরি অভিজিত বাবুর চাবি নিতে। সুনামগঞ্জ রোড দিয়ে সম্ভবত এই প্রথম আমার এত দূরের যাত্রা। আব্বার কাছে পাগলাবাজার ইয়াসিন মির্জার বিখ্যাত মসজিদ ও বীরগাঁও চৌধুরীবাড়িতে সুনামগঞ্জের কানুনগো হিসাবে তার পরিদর্শনের কাহিনি শুনতাম। ব্যবস্থাপক অভিজিত চৌধুরী একজন বুদ্ধিমান আউল বাউল শিল্পী মানুষ। গাণিতিক মগজ তেমন শক্তিমান না হলেও তিনি বুদ্ধিবলে মানবশক্তি পরিচালনা করে শাখা ব্যবস্থাপনা সুন্দরভাবে চালিয়ে নিতেন।

প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখার আমার এক দুর্নিবার আকর্ষ। আসার সময় বাস হতে মসজিদটির গম্বুজ দেখেই সিন্ধান্ত নিলাম ইয়াসিন মির্জার মসজিদে জোহরের নামাজ পড়ব। একটি সুন্দর ছোট্ট প্রশান্ত নদী, নাম তাঁর মহাসিং। অসংখ্য কাজলদিঘি একটার পর একটা পাশাপাশি যোগ করে দিলে যে চেহারা আসবে এই সুন্দর নদীটি তাই। মেঘালয়ের পাহাড়ের ঝর্ণার স্বচ্ছ জলধারা বয়ে নিয়ে আসা মহাসিং নদীর সুন্দর পার দিয়ে হেঁটে হেঁটে জলমহালদার ইয়াসিন মির্জার বাড়ির নদীঘাটে পৌঁছি। প্রাচীন এই মৎস্য জমিদারের বাড়িটি পেরিয়েই দুতলা এই অপুর্ব সুন্দর গম্বূজওয়ালা মসজিদে জামাতে নামাজ পড়ি। এযেন দিল্লির শাহি মসজিদের এক ছোট্ট সংস্কর। মসজিদের জামাতে মুসল্লি তেমনটি নেই, একলাইনও পুর্ণ হয়নি। মসজিদের নদীঘাটে বসে পাশে কমলারানি দিঘিবেশে সুসজ্জিত মহাসিং নদীর রূপদেখে বিমোহিত হই। ১০ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালে অভিজিত বাবু ফিরে এলে আবার চলে আসি সিলেট শাখায়।

২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সাল। এবার ছুটলাম কুশিয়ারাপারে মিরগঞ্জ শাখায়। জকিগঞ্জের জাতক ব্যবস্থাপক জি এম রুহুল আমিন যাবেন ছুটিতে। বাসে মোকামবাজার পৌঁছলাম। তখনও কুড়ানদীর উপর ব্রিজ ছিলনা। নৌকায় ওপারে গিয়ে মান্ধাতা আমলের কিছু লক্কর যক্কর মার্কা জিপের দেখা পেলাম। কয়েকজন যাত্রী ধাক্কা মেরে জিপটি স্টার্ট দেন। গর্তেভরা ভাঙাচুরা রাস্তা দিয়ে হেলেদুলে জিপটি কুশিয়ারাপারের মিরগঞ্জ বাজারে গিয়ে পৌঁছে। একজন কাস্টমার বললেন তাঁর বাড়ি খাটখাই। তাঁর গ্রামের এই অদ্ভুদ নাম খাটখাই শুনে বেশ হাসি পায়। এই কাস্টমারকে কৌতুক করে বললাম, খাটখাই এর বদলে খাট ভাঙ্গি হলে কেমন হত। মিরগঞ্জ হতে ফিরে এলাম ২৭ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬

আমার জন্মভুমি চৌধুরীবাজার শাখায় কাজ করে প্রায়ই দারুণ মজা পেতাম। এই শাখার ব্যবস্থাপকগণ ছূটি চাইলেই আমি সেখানে রিলিভিং ম্যানেজারের দায়িত্ব পেতাম। আমার শত জনমের প্রিয়জনদের সাথে বারবার সাক্ষাতের এই সুযোগ আমাকে পুলকিত করত। ১৬ মার্চ ৯৬ হতে ২৩ মার্চ ৯৬ বসন্তের এই সাপ্তাহকাল বাড়িতে থেকে ব্যবস্থাপক সাইদুর রহমানের ছুটিকালে সেখানে অফিস করি। 

বয়স ত্রিশ পেরুলেও সিলেট বিভাগের অনেক উপজেলায় এখনও এই বান্দার পদচিহ্ন পড়েনি। এযেন ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে বাইরে দু পা ফেলিয়া’। সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার লোকজনের সাথে চলাফেরা করি, অথচ তাদের অঞ্চল দেখিনি। সহকারী মহাব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন স্যারের আমলে আমার সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সবকটি উপজেলা ঘুরে দেখার মনোবাসনা জেগে উঠে। এই সুযোগ নিতে কিছুদিনের জন্য সিলেট শাখার ক্যাশ রিমিটেন্স দলে ঢুকে গেলাম।

রিমিটেন্সের গাড়িতে উঠে প্রথম দিনই ছুটলাম ছোট্ট অনুশহর জকিগঞ্জ। পুর্ব সীমান্তের এই অঞ্চলে নাকি বাংলাদেশের প্রথম সুর্যোদয় ঘটে। চারখাই পেরিয়েই সড়কটির অবস্থা ছিল শোচনীয়। আমরা কালিগঞ্জ শাখায় রিমিটেন্স প্রদান করে দ্রুত জকিগঞ্জের পানে ছুটলাম। সিলেট হতে কালিগঞ্জ ৩৬ মাইল ও জকিগঞ্জ ৫৫ মাইল দুরে অবস্থিত। তখন জকিগঞ্জের ব্যবস্থাপক ছিলেন ভাদেশ্বরের হেলালউদ্দিন স্যার। তিনি একজন প্রাণবন্ত দিলখোলা লোক। আমাকে নিয়ে তিনি জামাতে যোহরের নামাজ পড়েন। একটি হোটেলে নিয়ে আমাদের রিমিটেন্স টিমের সবাইকে তার তরফ হতে দুপুরের লান্স করান।

এইবার হেলালউদ্দিন স্যার আমাকে নিয়ে জকিগঞ্জ শহর দেখাতে বের হন। বরাক নদীর পারে দাড়িয়ে ওপারের বহু জানাশুনা করিমগঞ্জ শহর দেখলাম। এই শহরটি ১৯৪৭ সালে সিলেট জেলার অঙ্গ হতে খসে পড়া তৎকালীন করিমগঞ্জ মহকুমা শহর। নদীটির মধ্যভাগ বরাবর ভারত ও বাংলাদেশের সীমারেখা বয়ে গেছে। আমি ও হেলালউদ্দিন স্যার প্রায় ঘন্টাখানিক সময় পাশাপাশি হেঁটে হেঁটে পুরো জকিগঞ্জ বাজার এলাকা দেখে নেই। এপার হতে দেখা ওপারের করিমগঞ্জ শহরটিকে আমার চোখে কেমন যেন এক নিস্প্রভ নগর মনে হলো। উন্নত দালান নেই কেবল ভাঙ্গাচুরা টিনের পাকা বাড়িঘর নজরে পড়ে। ওপারের মন্দির হতে নদী পার হয়ে মাইকে শাস্ত্রপাঠের সহিত ঢোল করতালের শব্দ ভেসে আসে। নদীপথে নৌকায় মালামাল ও লোকজন এপার ওপার চলাচল করতেও দেখি। নদীর দুইপারে দুইদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর তৎপরতা আমার নজর কাড়ে। হেলালউদ্দিন স্যার কথা বলার সময় তার ঠোঁটে একটা মিষ্টিমধুর হাসি লেগে থাকত। তার বদান্যতা ছিল আকাশছোঁয়া। ভাদেশ্বরের জাতক হেলালউদ্দিন স্যার এখন আর দুনিয়ায় নেই। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাত দান করুন।  

ক্যাশ রিমিটেন্স টিমে যোগদিয়ে এবার আমার নতুন নতুন জায়গা দেখার ঢল নামল। গেলাম কুশিয়ারা পারের বালাগঞ্জ, লন্ডনিদের বিশ্বনাথ, গোয়াইনপারের গোয়াইনঘাট, জৈন্তার দরবস্ত, আমার গ্রামের রাস্তা ধরে ফেন্সুগঞ্জ, টিলাটক্করে ভরা বিয়ানীবাজার, চৌধুরীবাজার, চন্দরপুর, আসিরগঞ্জ, মিরগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, তাজপুর, গোয়ালাবাজার, সিঙ্গেরকাছ, গোবিন্দগঞ্জ ইত্যাদি। সিলেটের না দেখা বিভিন্ন উপজেলার অনেক অনেক গঞ্জ, পুর, ঘাট, হাট ও বাজার সবেগে অল্প কয়েক দিনেই ঘুরে দেখা হল। ক্যাশ রিমিটেন্স গাড়ির চালকের পাশের সিটে বসতেন একজন ক্যাশিয়ার ও কর্মকর্তা আমি ইসফাক কুরেশি। পিছনে টাকার বস্তা নিয়ে পাহারা দিতেন দুইতিন জন বন্দুকধারী গার্ড। তখন নিজেকে ক্যাডার বাহিনীর বেশ একজন হোমরা চোমরা মনে হত, আবার ভয় হত বিপদ হলে এই ক্যাডারি একদম শেষ।                

শখ করে রিমিটেন্সে গিয়ে মাসদেড়েক দৌঁড়েই আমি হাঁফিয়ে উঠি। সকাল ৯/১০টায় বের হয়ে ফিরে আসতে প্রায়ই রাত ৭/৮টা বেজে যেত। তারপর আবার আট নয় মাইল দূরের দাউদপুর গ্রামে ফিরতে বেশ রাত হত। যা ছিল খুব কষ্টকর। রাতে শরীরটা বেশ ঝিমিয়ে যেত। ক্যাশে তখন তীব্র লোকবল সংকট। আমি ক্যাশের লোক নই, অথচ শখে করে রিমিটেন্সে গিয়ে কি বিপদেই না পড়লাম। না পারি রাখতে, না পারি ছাড়তে। শেষে বেশ কৌশল করেই রিমিটেন্স টিম হতে বেরিয়ে আসতে হলতবে আমার অভিযান ইতিমধ্যে শতভাগ সফল হয়ে গেছে। পুবালী ব্যাংক সিলেট শাখার রিমিটেন্স টিম যত যত জায়গায় যায়, তার সবটুকুই চাক্ষুস দেখা হয়ে গেছে। 

১৯৯৬ সালের ২৪ অক্টোবর হতে ২৯ অক্টোবর  এবং ১৯৯৭ সালের ১লা মার্চ হতে ৬ মার্চ দুইবার আমি সিলেট শহরের এগার মাইল পূর্বে সুরমাপারের গোলাপগঞ্জ শাখায় রিলিভিং ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করি। এই শাখার সন্নিকটে ফুলবাড়ি ও রনকেলী গ্রামে আমাদের অনেক আত্মীয়স্বজনের স্থায়ী নিবাস। সেখানে অনেক পুরানো আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সাথে দেখা হয়। 

এই শাখার ব্যবস্থাপক মোস্তফাউদ্দিনের বাড়ি দেড়মাইল দূরের পাহাড়ি গ্রাম বারকোট। গ্রামে তার দুতলা সুন্দর বাড়ি থাকা সত্বেও তিনি তার সুন্দরী পত্নীকে নিয়ে ব্যাংকের সামনে একটি ভাড়া করা ছোট ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। অফিসের কাজের লোক একদিন বলল ম্যানেজার স্যার অফিসে আসার সময় বেগম সাহেবাকে ঘরে রেখে বাহিরের দিকে তালা মেরে আসেন। সিলেট শাখার আবুসফিক ভাই এই ব্যাপারটি জানতে পেরে একবার মোস্তফাউদ্দিন স্যারকে টিপ্পুনী কাটলে তিনি জবাব দেন, ভাই মেয়েমানুষকে কোনদিন বিশ্বাস করতে নেই। অবাক করা ব্যাপার ছুটি নিলেও মোস্তফাউদ্দিন প্রতিদিন একবার শাখায় এসে নজরদারি করতেন যদি কোন অঘটন ঘটে যায়। আমার বুঝতে অসুবিধা হলনা তিনি একজন মানসিক শান্তিহীন বিকারগ্রস্ত লোক, যিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় সন্দেহপ্রবণতা রোগে আক্রান্ত।

১৯৯৬ সালে আমার শ্বশুর এনামউদ্দিন চৌধুরী ও শ্বাশুড়ি মলিকা খাতুন পবিত্র হজ্জ পালন করেন। আমার পাশের তুড়ুকখলা গ্রামের শাহদাউদ ট্রেভেলসের মাধ্যমে হজ্জযাত্রার আয়োজন করি। আমার শ্বশুর তার আমেরিকা প্রবাসী পুত্র শাহজাহান চৌধুরীর পরামর্শে চুনিয়া বিলের কিছু জমি আব্দুস সাত্তারের কাছে বিক্রি করেন এবং এই টাকায় হজ্জের সমুদয় খরচপাতি বহন করেন। মদিনায় অবস্থানকালে শ্বশুর এনাম উদ্দিন চৌধুরী অসুস্থ হয়ে খানিকটা অর্থসংকটে পড়লে মদীনায় চাকুরীরত ডাঃ নূরজাহান বেগমের মামাত ভাই প্রকৌশলী আরবাব আহমদ চৌধুরী তাদেরকে সহায়তা করেন।

এই সময় একদিন হঠাৎ আমার বাসায় ফোন আসে ছোটভাই নিশাত ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি। ফোন করে এক অজ্ঞাত ভদ্রলোক বললেন এক্সিডেন্ট করে সে একটু আহত হয়েছে। আমি ও ডাঃ নুরজাহান বেগম সবকাজ ফেলে গাড়ি নিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে ওসমানীর ইমার্জেন্সিতে গিয়ে দেখি অসংখ্য তরুণ বয়সী ছাত্রদের ভিড়। হাঁটুর নিচে ও হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। সে তখন বাংলাদেশ ছাত্রলিগ জেলা কমিটির সদস্য। এই কমিটির সভাপতি ছিলেন শফিউল আলম নাদেল এবং সাধারণ সম্পাদক নাসির খান। প্রথমে কোনকিছু টাহর না হলেও পরে বুঝলাম সে এম সি কলেজের ছাত্রলিগের কোন্দলের শিকার হয়েছে। তবে যারাই এই অপকর্মটি করুক না কেন, তারা ভয় দেখানোর জন্য হালকাভাবে হাতে ও পায়ে ছুরিকাঘাত করেছে, হত্যাকান্ড ঘটানো তাদের কোন উদ্দেশ্য ছিলনা। হামলাকারীরা তার মোটরসাইকেল ভেঙ্গে টিলাগড়ের রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। এই খবরটি সিলেট ঢাকার অনেক পত্রিকায় প্রকাশ হয়। পরদিন হাসপাতালে তাকে দেখতে আসেন ছাত্রলীগ সভাপতি নাদেল, মেয়র কামরান, মিছবাহ উদ্দিন সিরাজ ও গণনেতা দেওয়ান ফরিদ গাজি। 

আমি সবসময় তাকে নিয়ে খুব উদ্ভিঘ্ন থাকতাম এবং সর্বদা দোয়া করতাম আল্লাহ পাক যেন কোনমতে নিরাপদে তার শিক্ষা জীবনটা সমাপ্ত করে দেন। ইতিমধ্যে সে এম সি কলেজ হতে অর্থনীতিতে অনার্স ফাইন্যাল পরীক্ষা দিলে আমি কিছুদিনের জন্য নিশ্চিন্ত হই। সে অনার্স পরীক্ষায় ২য় বিভাগে ভাল নম্বর পেয়ে পাস করে। এই কলেজে মাস্টার্স চুড়ান্ত পরীক্ষার আগেও টিলাগড়ে তার মোটর সাইকেলে হামলার ঘটনা ঘটে। মাস্টার্স পরীক্ষায়ও সে দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে শিক্ষাজীবনের ইতি টানে এবং আমিও একটা সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তা হতে রেহাই পাই।  

১৭ ডিসেম্বর ১৯৯৬ সাল। ব্যবস্থাপক এ কে এম মহিউদ্দিন সিলেট শাখা হতে বিদায় নেন। স্থায়ী কোন ব্যবস্থাপক ছাড়াই ব্যস্ত এই শাখাটি প্রায় একমাস পার করেআমি ব্যবস্থাপক চেম্বারের বাহিরে তাঁতিপাড়ার বিধানবাবু ও কুলাউড়ার বুকশিমুলের আবুশফিক ভাইয়ের পাশের চেয়ারে বসে ডিডি, টিটি, এমটি এবং পে-অর্ডার ইস্যু করতাম। এখানে ছিল প্রচন্ড কাজের চাপ, মস্তক সোজা করার কোন উপায় ছিলনা। প্রতিদিন বিকেলে ঘাড়ের চিমচিম ব্যথা নিয়ে বাসায় ফিরতাম।

আমার পাশের আরেক চেয়ারে বসতেন সুধীর কুমার দাস। আবু সফিক ভাইয়ের পত্নী অকালে মারা গেলে তার বৃদ্ধা মা বাসায় সন্তানদের লালন পালন করেন। সুধীর বাবুর ঘরের বৌদি ছিলেন খুবই সুন্দরী একজন প্রাইমারি শিক্ষিকা। আবু সফিক ভাই প্রায়ই সুধীর বাবুকে বলতেন, সুধীর বাবু তুমিরেবা দাদা খুব ভাগ্যবান। আমি কেন ভাগ্যবান? সুধীর বাবু জানতে চাইলে আবুসফিক ভাই বলতেন, কি সুন্দরী বউ পাইছো, এমন রূপসী বউ কয়জনের কপালে জুটে। সুধীর বাবু জবাব দিতেন- তোমার পালঙ্গ বহুবছর ধরে খালি পড়ে আছে। একজন সুন্দরী বউ ঘরে এনে আমার মত তুমিও ভাগ্যবান হতে আপত্তি কিসের। জলদি একজন সুন্দরী জোগাড় কর। পাশের চেয়ারে বসা গম্ভীর ভদ্রলোক বিধান কুমার রায় এসব চটুল কথাবার্তা পছন্দ করতেন না। তাদের আলাপচারিতায় ভব্যতার সীমা পার হয়ে গেলে বিধান বাবু মাঝে মাঝে ধমক দিতেন- তোমরা দুইজনের মুখে খালি বেটিন্তর মাত, খালি বেটিন্তর মাত। এবার আল্লার ওয়াস্তে তোমরার মুখখানতা বন্ধ কর তোমরার এত বয়স হইছে, আর কত বয়স হলে যে তোমরার মাঝে হুশজ্ঞান হইব। 

আবু সফিক ভাই নিজের জন্য রোজ রোজ কনে খোঁজে ফেরেন। সামনে আসা লোকজনের কাছে কনের খোঁজ দিতে অনুরোধ করেন। একিসাথে তিনি তার সাবেক পত্নীর প্রশংসায়ও সর্বদা পঞ্চমুখ থাকেন। তবে এত পুত্রকন্যার সংসারে সবকাজ একহাতে করে আরেক বউয়ের দায়িত্বগ্রহণ এত সহজ ব্যাপার ছিলনা। এক সময় একজন মধ্যবয়সী মহিলাকে তিনি বিয়ে করেন। এই ভদ্র মহিলা প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য, তিনি নাকি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর ফুফু। এই বিয়ে করে আবুসফিক ভাই ফাটাবাঁশের চিপায় আটকা পড়েন এবং শেষপর্যন্ত ছয়লক্ষ টাকা মোহরানা দিয়ে প্রাণ বাঁচান। বিবি তালাক হয়ে গেলে আবুসফিক ভাই বললেন, আমি হাবিয়া দোযখে গিয়া পড়ছিলাম, আল্লাহপাক আমারে বাঁচাইলেন। শোকর আলহামদুলিল্লাহ। ব্যাংক থেকে অবসর নিয়ে আবুসফিক তাঁর নবনির্মিত সোনারপাড়ার বাসায় ছিলেন। এক সময় তিনি ক্যান্সারাক্রান্ত হন। তাঁর সাথে আমার শেষ দেখা হয় সিলেটের স্কয়ার হাসপাতাল সেন্টার, কাজলশায়। কিছুদিন পর খবর পাই তিনি মারা গেছেন। আমিন।             

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন