ফুলসাইন্দ
পল্লী হাসপাতালের সুচনাকারী ডাঃ নুরজাহান বেগম চৌধুরীঃ
একদিন সিলেটের বাসায়
এসে দেখা করেন একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক, তিনি ওয়ালী খান। তার বাড়ি পাহাড়ি গ্রাম ফুলসাইন্দ। আমার
বাড়ি হতে পাহাড় লাইনে প্রায় তিনচার মাইল পুর্বদিকে অগ্রসর হলেই লালমাটির এই
পার্বত্য গ্রামটির অবস্থান। বললেন, তার গ্রামের প্রবাসীরা একটি হাসপাতাল করবেন। আপাততঃ
শুক্রবারে নারী ও শিশুদের চিকিৎসা চলবে, পরে বড় হাসপাতাল করা হবে। এই
হাসপাতালে প্রতি শুক্রবার রোগী দেখার জন্য তিনি অনুরোধ জানান। তার অনুরোধে আমরা প্রথমে রাজি না হলেও পরে মনে
হল একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্মদাতা চিকিৎসক হওয়া কম কথা নয়।
প্রথম
শুক্রবার দাউদপুর হতে আমরা সেখানে গিয়ে প্রচুর রোগীর ঢল দেখে অবাকই হলাম। এই প্রত্যন্ত
জায়গায় অগণিত রোগীরা কোথা হতে এসে এত ভিড় জমাল যেন গরুসিন্নী খাবার জন্য ঠেলাঠেলি। ডাঃ
নুরজাহান বললেন এত এত রোগী একজন চিকিৎসকের পক্ষে যথাযতভাবে দেখা সম্ভব নয়। ওয়ালী
খান বললেন, এত ভালভাবে দেখার দরকার নেই, কেবল কলমটা ভিজালেই চলবে। তবে ডাঃ
নুরজাহান বেগম চৌধুরী যত্নের সাথে রোগী দেখলেন। কারণ কাজে ফাঁকিবাজি ও রোগীদের সাথে প্রতারণা করা তাঁর অভিধানে নেই। সারাদিন রোগীদেরকে প্রচুর ঔষধ বিনামূল্যে বিতরণ করা হল।
জুমুয়ার
নামাজ পড়ে ওয়ালী খানের টিলাবাড়িতে দুপুরের খাবার খেয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম।
সামনেই একটি কবরে চিরশায়িত আছেন আমার তুড়ুকখলা পাঠশালার প্রিয় শিক্ষক মইনউদ্দিন খান, যিনি
ওয়ালী খানের ভাতিজা। পাঠশালা জীবনের নানা স্মৃতি উঁকি দিল মনের জানালায়, প্রাণভরে মইন স্যারের জন্য দোয়া করে জেয়ারত শেষ করলাম।
ফুলসাইন্দ
পল্লী হাসপাতাল নির্মাণের জন্য একটি টিলা ক্রয় করেছেন প্রবাসীরা, ওয়ালী খান সেই
জায়গাটিও ঘুরে দেখালেন। একদিন হাসপাতালের কার্যক্রম দেখতে আসেন একজন ইংরেজ
ভদ্রলোক, যার এই খাতে প্রচুর অনুদান রয়েছে। এই শ্বেতাঙ্গ সাহেব এই এতএত নিরক্ষর
ময়লা পুষ্টিহীন নারীশিশুদের চিকিৎসা নিতে দেখে মনে করলেন এদের জীবনপদ্ধতি উন্নত
করতে পারলে অনেক রোগ ঠেকানো যাবে। ফান্ডদাতা এই বিদেশি চাইলেন পরবর্তী শুক্রবার লোকজনকে স্বাস্থ্যকর জীবন ও
রোগ সম্পর্কে শিক্ষা দিতে একটি গণসেমিনার করা হউক। এবার
ওয়ালী খান পরবর্তী শুক্রবার এসব রোগীদেরকে নিয়ে রোগ ও পুষ্টি বিষয়ক
একটি গণশিক্ষা সভার আয়োজন করলেন।
ওয়ালী খান এই সেমিনারে এবিষয়ে ইংরেজিতে একটি ভাষণ দিতে আমাকে অনুরোধ করেন, সেইসাথে আমাকে এই হাসপাতালের পরিচালক করার ইশারা দেন। পরবর্তী শুক্রবার রোগী দেখা ও গণস্বাস্থ্য সেমিনার, দুটোই হল। বড় একটি ঘরের মেঝে পঙ্গপালের মত ভিড় জমানো সব মা ও শিশু রোগীদের বসানো হল। একটি হোয়াইট বোর্ডে ছবি এঁকে এঁকে লাউড স্পিকারে লন্ডন হতে আগত ইংরেজ শ্বেতসাহেব এসব লোকজনকে পরিচ্ছন্নতার অনেক অনেক উপকার ও পুষ্টিজ্ঞান বিতরণ করলেন। কৃমি, ডায়রিয়া, জ্বর, কলেরা ইত্যাদি রোগের কারণ ও এসব রোগ হতে বাঁচার উপায় বাতলে দেন। এইসব উম্মি লোকজন লালসাহেবের ইংরেজি কথাবার্তার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে বলে মনে হলনা, অথচ মাথা নেড়ে নেড়ে এমন আচরণ করল যেন তাঁরা সবকিছু বুঝে ফেলেছে। সবাই এমন হাবভাব করল যেন এই সেমিনারের মাধ্যমে এই রোগীদের মহাউপকার হয়ে গেছে।
ডাঃ নুরজাহানও এই সেমিনারে বাংলায় বক্তব্য রাখেন। আমি এই বিষয়ে ইংরেজিতে সুদীর্ঘ বক্তব্য রাখি। এই বক্তব্যই মনে হয় আমার জীবনের প্রথম ইংরেজি ভাষণ। তাই এই ভাষণটি আমার কাছে স্মরণীয় একটি ঐতিহাসিক ভাষণই বটে। আমার এই ভাষণ শ্রবণ করে বৃটিশ ভদ্রলোক ভাল বেতনে আমাকে এই প্রতিষ্ঠানের ডায়রেক্টার হবার প্রস্তাব দেন। ব্যাংকের চাকুরি ইস্তোফা দিয়ে সেখানে চলে গেলে অনেক বেশি বেতন পেতাম কিন্তু এই চাকুরি যদি কদিন পর ফানুস হয়ে যায়।
এতএত রোগী প্রতি শুক্রবারে গিয়ে দেখা বেশ কষ্টকর কাজ, তাই আমার পত্নী নুরজাহান বেগম সিলেট মেডিকেল হতে সদ্য পাস করা হবিগঞ্জের জাতিকা অল্পবয়স্কা তরুণী চিকিৎসক ডাঃ শিরিন আক্তারকে ফুলসাইন্দ পাঠিয়ে দিয়ে কোনমতে সরে আসেন।
আমাদের হাতে সূচনা করা ফুলসাইন্দ পল্লী হাসপাতাল এখন একটি টিলার উপর সাজানো তিনতলা সুরম্য হাসপাতাল। এই হাসপাতালটি এখন ব্যবস্থাপনা করছে আমাদের মালিকানাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান নর্থইস্ট মেডিকেল কলেজ এন্ড সার্বিসেস লিমিটেড।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন