শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

শ্বশুর এনাম উদ্দিন চৌধুরীর শেষবিদায়ের সকরুণ দিনগুলোঃ

 

শ্বশুর এনামউদ্দিন চৌধুরীর শেষবিদায়ের সকরুণ দিনগুলোঃ

১৯৮৭ সালে খাদ্য বিভাগের সরকারি চাকুরি হতে অবসর গ্রহণ করে আমার শ্বশুর ও শ্বাশুড়ি সিলেট শহরে বসবাস শুরু করেন। বৃদ্ধ বয়সে আমার শ্বশুর এনামউদ্দিন চৌধুরী স্থুলদেহ ও অতিরিক্ত ওজনের জন্য আরথ্রাইটিস, শ্বাসকষ্ট, বিষব্যদনাসহ নানা রোগে ভোগতেন। তার একপুত্র আজিজ চৌধুরী জুয়েল ঢাকায় ও অন্য দুইপুত্র জামিল আহমদ চৌধুরী শাহজাহান ও কবির আহমদ চৌধুরী সহুল যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করায় একমাত্র কন্যা ডাঃ নুরজাহান বেগম চৌধুরী সিলেটে তাদের সেবাযত্ন ও দেখাশুনা করতেন।

নানা শারীরিক সমস্যা সত্বেও ২০০২ সালের প্রারম্ভে আমার শ্বশুর এনামউদ্দিন চৌধুরী বাৎসরিক ধানকাটা ও ধান্যসংগ্রহ উপলক্ষে জন্মভূমি সাচান যাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে যানআমি অফিসের গাড়ি নিয়ে এক শুক্রবারে তাদেরকে সেখানে রেখে আসি। এই হল মাতৃগ্রাম সাচানে আমার শ্বশুর ও শ্বাশুড়ির জীবনের শেষ গমন ও জনমমাটির প্রিয় লোকজনের সাথে শেষ মেলামেশাসেখান থেকে ফিরে আসার কিছুদিন পর খাবার খেতে বসলে খাদ্যনালী দিয়ে খাবার যেতে তিনি একটু একটু বাঁধা অনুভব করেন। এই বাঁধা বা গাট দ্রুত বাড়তে থাকে। তাকে খিচুড়ি ও তরল খাবার পরিবেশন করা হয়। তাঁর প্রিয় নাতি নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ সৈয়দ মোহাম্মদ সাদিকে দেখানো হলে তিনি দ্রুত ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন। 

আমার ঢাকার সমনদিক আজিজ ভাইকে সব জানান হল। তিনি তার গাড়ি নিয়ে সিলেটে এসে তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যান। তিনি তার প্রিয় কন্যা ডাঃ নুরজাহান বেগম ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। তাই কন্যাও সবকাজ ফেলে রেখে বাবার সাথে ঢাকা ছুটলেন। একটি ছোট অপারেশন করে খাদ্যনালীর টিউমারের সামান্য মাংস নিয়ে বায়োসফি পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট আসল খাদ্যনালীতে ক্যান্সার হয়ে গেছে। সেইসাথে বলা হল খুব তাড়াতাড়ি অপারেশন করা না হলে খাদ্যনালী অচিরেই পুরোপূরি বন্ধ হয়ে যাবে। তাকে কিছুই জানানো হলনা, অপারেশনের জন্য তৈরি করা হল। তিনি জানলেন না তাঁর ক্যান্সার হয়েছে, তাই তিনি আশাবাদী অপারেশন হলে আগের মত ভাল হয়ে যাবেন। ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে একদিন অপারেশন করা হল, খাদ্যনালীর বেশ কিছু অংশ কেটে বাদ দেওয়া হল। পাকস্থলীতে খাবার পাঠানোর জন্য পেঠের মধ্যে ছিদ্র করে বাইপাস খাবার নল বসানো হল। তিনি ভাবলেন গলা ভাল হলে এই নল খুলে ফেলা হবে।

কিছুটা সুস্থ হয়ে সিলেট ফিরে এলেন। এবার মুখদিয়ে খাওয়া দাওয়া বন্ধ। নল দিয়ে পাঠান তরল খাদ্যগ্রহণ করে তাকে বেঁচে থাকতে হল বেশ কয়েক মাস। দিনের পর দিন মুখদিয়ে কোন খানি পানি নেই। মাঝে মাঝে পানি মুখে নিয়ে মুখ ভিজিয়ে ফেলে দিতেন। সবাই খাচ্ছেন, পান করছেন, কেবল তিনি উপোষ, তা মেনে নিতে খুব কষ্ট হত কন্যা নুরজাহান বেগমের। তাই তার প্রিয় কন্যা কুরবানীর মাংস, পিঠা পায়েস, মজার ফলমূল বাবার মুখে তুলে দিতেন, কিছুক্ষণ চিবানো হয়ে গেলে অশ্রুসিক্ত চোখে বাবার সামনে চিলিমচি এগিয়ে দিয়ে ডাঃ নুরজাহান চৌধুরী বলতেন- অনেক হয়েছে, এবার ফেলে দাও বাবা তার বিশাল দেহ দিনের পর দিন চিকন হতে থাকে। আমেরিকা হতে তার দুই পুত্র শাহজাহান ও সহুল এসে শেষবারের মত পিতাকে দেখে কান্নাকাটি করে চলে যান। আমার শ্বাশুড়ি অতি পরিশ্রমি পতিপরায়ণা মহিলা। তিনি পতীর সেবাযত্নে এই বুড়ো বয়সে নিজেকে সঁপে দেন। তাকে সহায়তা করে সেনরা বিবি নামের কুমিল্লার একজন মহিলা সে রোগীর কাপড় ধোয়া, ময়লা পরিস্কার করা হতে সবকাজ সযতনে করে দিত। 

এবার সেনরা বিবির কিছু গল্প বলব। কিশোরী বয়সে তার এক আত্মীয় তাকে টাকার বিনিময়ে ভারতে পাচার করে দেয়। অসংখ্য বদলোকের নির্যাতনের শিকার হয়ে বাঁচার পথ খুঁজতে থাকে। এবার সে নিঁখুতভাবে পাগলনীর অভিনয় শুরু করে। তার আচরনে পাচারকারীরা তাকে পাগলী মনে করে আবার বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। দেশে এসে সমাজে তাঁর ঠাঁই হলনা, তাই কাজের সন্ধানে চলে আসে সিলেটে। এখানে অসুস্থ হলে ভর্তি হয় সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এই হাসপাতালে ডাঃ নুরজাহানের সহিত তার পরিচয় হয় ও সুস্থ হলে সে আমাদের বাসায় চলে আসেজীবন বাঁচাতে এবার হাওয়াপাড়ার এক সচ্ছল বুড়োকে সে বিয়ে করে। এক বর্ষণসিক্ত রাতে সেনরা এক গাট্টিবুচকা ও নবজাতক কন্যাশিশু নিয়ে আমাদের বাসায় হাজির হয়। এসে কয়েকদিনের আশ্রয় প্রার্থনা করে বলল, তার বুড়ো স্বামী কিছুদিন হয় মারা গেছে, এখন সতীনের পুত্ররা তাকে এই শিশুকন্যাসহ শূন্যহাতে বের করে দিয়েছে। 

সেনরার বুড়ো স্বামী ছিল খুব ফর্সা ও সুন্দর। তার কন্যাটি হয় বাপের অনুরূপ প্রতিমা। আমি ড্রয়িংরোমে গিয়ে ছোট্ট মশারির নিচে এক দুগ্ধধবল চাঁদবদনা শিশু কন্যাকে হাতপা ছুড়তে দেখে কেন যেন মনে হল এই সর্বহারা অসহায় শিশুটির অঙ্গ হতে জ্যোতি বেরুচ্ছে, নিশ্চয় এইশিশু স্রষ্টার আশির্বাদপুষ্ট তাই জীবনে খুব ভাগ্যবান হবে। আমি এই অসহায় রূপসী নবজাতক শিশুর লালন পালনের জন্য আল্লাহর কাছে হাত তুলে প্রার্থনা করলাম। কিছুদিনের মধ্যেই বিয়ানীবাজারের এক নিঃসন্তান দম্পতি এসে এই শিশুটিকে দত্তক হিসাবে নিউইয়র্ক নিয়ে যায় ও নিজ সন্তানের মত আদরযত্ন করে বড় করে। এই কন্যা শিশুটি আজ যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষিত ধনী নাগরিক এবং বিয়ানীবাজারের একজন ভদ্রলোকের জীবনসঙ্গিনী।

প্রথমদিকে আমার শ্বশুর ঘরে বাহিরে কিছু হাঁটাহাঁটি করতেন। শরীরের ওজন ধীরে ধীরে কমতে থাকে। মাঝে মাঝে আমাকে ডেকে নিয়ে পাশে বসিয়ে বলতেন, আমি চিটি লিখব। তার হাতে কলম ধরার মত তেমন শক্তি নেই। লেখা আঁকাবাঁকা হয়ে যায়। তাই তিনি বলতেন ও আমি লিখতাম। চাকুরি জীবনের অনেক সহকর্মীদের কাছে আমি তার পত্র লিখে দিতাম। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর, ইংরেজি খুব ভাল জানতেন। পুরান দিনের লোকজনের ঠিকানাও তার মুখস্ত। কারও ঠিকানা সুনামগঞ্জ, কারও মৌলভীবাজার, কারও হবিগঞ্জ। আমি এসব লোকদেরে চিনিনা, জানিনা। অথচ রুমালে চোখ মুছে মুছে তার শেষ জীবনের হৃদয়ের আকুতি ভরা শেষ পত্রগুলো একের পর এক লিখে দিয়েছি একবুক যন্ত্রণা নিয়ে। এযেন জীবন হতে চলে যাবার আগে একজন নিশ্চিত পরকালযাত্রীর একটি বারের জন্য পুরানদিনের প্রিয় মানুষগুলোকে শেষবারের মত চোখে দেখার জন্য কষ্টে ফেলা বিষাক্ত নিঃশ্বাস। এই শেষপত্র পেয়ে কেউ কেউ এসে দেখা করলেন, আবার যারা আসতে পারেননি, তাঁদের কেউ পাঠালেন প্রতিউত্তর। তখন মোবাইল ছিলনা, তাই পত্রই ছিল একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। সবপত্রের জবাব আমার হাতে এলো, আমাকে কাঁদাল, ভাবলাম পত্রমিতালী কি এত করুণ ও নিষ্টুর হতে পারে। তিনি চিরবিদায়ের পরও তাঁর চিটির অনেক জবাব পেলাম, যা আমি ডাঃ নুরজাহান বেগমকে জানাইনি, নাজানি তিনি মনে কষ্ট পান। 

একজন বাবার তার একমাত্র কন্যার প্রতি কতটুকু যে হৃদয়ের টান থাকতে পারে তারও একজন স্বাক্ষী হলাম আমি। তখন সাগরদিঘীর পার আমার বাসার নির্মাণ কাজ চলছিল। আমার গৃহনির্মা ও আমাদের দুজনের অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে হাতে জমা সামান্য টাকায় বাসার কাজ যে সমাধা করা সম্ভব নয় তা তিনি খুব ভালভাবে জানতেন। মরণশয্যায় শুয়ে শুয়ে তিনি সাচান গ্রামের সুরমাপারে একটি জমি বিক্রি করে মেয়েকে বাসা নির্মাণে সাহায্য করতে চাইলেন। গ্রামের জমি দেখাশুনার দায়িত্ব থাকা আব্দুস সত্তার জমিটি দুইলক্ষ টাকায় বিক্রয়ের ব্যবস্থা করলেন। আমি ও ডাঃ নুরজাহান চৌধুরী তখন সাচানের বাড়িতে শিন্নী ও সাহায্য বিতর করার জন্য গমন করি।

সব কাজ সমাপ্ত হলে আমরা পাশের দক্ষিণে আমার ফুফু শ্বাশুড়ির  বাড়িতে ফুফুতো বোন হেনা খানম আপাকে দেখতে যাই। এমন সময় আব্দুস সত্তার জমির মূল্যবাবদ দুই লক্ষ টাকা আমাদের হাতে পরিশোধ করে। এই লেনদেন দেখে ফেলেন নুরজাহান বেগমের ফুফুতো বোন হেনা আপার স্বামী একজন বেঁটে প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক। তিনি সুদূর রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত খবর পাঠান গ্রামের পিছন দিকে একজন মাইমল (মৎস্যজীবী) লোক জমি কিনে বাড়ি বনিয়ে সাচান গ্রামের ইজ্জত নষ্ট করে ফেলবে। অথচ জমিটির অবস্থান সাচান গ্রাম হতে প্রায় অর্ধ কিলোমিটার পশ্চিমে সুরমানদীর পারে। সাচান গ্রামের ইজ্জতের হেফাজতকারী এই ভদ্রলোকের বাড়ি কিন্তু বাংলাদেশে নয়, ভারতে এই গ্রামে তিনি দীর্ঘকাল ধরে শ্বশুরের ভিটায় বসবাস করছেন। এই ভদ্রলোকের একটি মেয়ে অক্ষম বোধহীন। এই মেয়ের বিয়েসাদি হয়নি। আমার শ্বশুর এনামউদ্দিন চৌধুরী এই মেয়ের দেখাশুনার জন্যও কয়েক বছর আগে বেশকিছু জমি দান করেন।

দুইদিন পর সুরমাপারের জমিটি রেজিস্ট্রেশন হবার কথা ছিল, কিন্তু ঢাকা হতে নির্দেশ আসে এজমি বিক্রয় করা যাবেনা। আব্দুস সত্তার বলল এই জায়গার বদলে দূরের কোন একটি জায়গা রেজিস্ট্রেশন করে দেওয়া হউক। কিন্তু সুতীব্র বাঁধায় তাও করা সম্ভব হলনা। আমার শ্বশুর জমি বিক্রির কথা দিয়ে দুইলক্ষ টাকা গ্রহণ করে শেষমেশ কথা রাখতে পারলেন না। তিনি ছিলেন খুব সহজ সরল প্রকৃতির ভদ্রলোক। কোনদিন তার কথার বরখেলাফ হয়েছে এমনটি তাঁর কোন দুষমনও বলতে পারবেনা। বিষয়টা নিয়ে তিনি অসুস্থ শরীরে অশ্বস্তি করতে দেখে আমি ও নুরজাহান বেগম বললাম, আমরা মনে করব বাবা, আপনার কাছ হতে দুইলক্ষ টাকা বাসা নির্মাণে সাহায্য পেয়ে গেছি। এবার আব্দুস সত্তারকে বলুন আপনাকে দেওয়া দুইলক্ষ টাকা সে যেন এসে নিয়ে যায়। পরদিন চুনিয়া বিলের একটি বড়মাছ নিয়ে আব্দুস সত্তার বাসায় হাজির হলে আমি দুই লক্ষ টাকা তার হাতে ফেরত দিয়ে সাচান গ্রামের ইজ্জত রক্ষা করি। 

তখন শহরে বাড়ি নির্মাণে গিয়ে অর্থসংকটে পড়ে আমাদের আত্মীয় রণকেলি বড়বাড়ির জাতক ওরিয়েন্টাল ইসলামী ব্যাংক সিলেট শাখার ব্যবস্থাপক ইমানি চৌধুরীর চেম্বারে ধর্না দেই। ফর্সা সুদর্শন আভিজাত চেহারার ইমানি চৌধুরী কোন যাচাই বাচাই ছাড়াই ২০০২ সালে এক লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার টাকা ঋণ দেন যা মাসিক কিস্তিতে ছয়ত্রিশ মাসে পরিশোধ করি। 

সাচানের একটি মেয়ে এসা বেগম আমাদের বাসায় কাজ করত। তাঁর মা গ্রামের বাড়িতে ধান ঊঠাত। এসার চাচাতো ভাইরা বিদেশে গিয়ে ধনী হয়ে পাকাঘর নির্মাণ করে। তারা এসাদের বাড়ি তাদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য করার জন্য বাড়ির রাস্তা পাকা দেয়াল দিয়ে বন্ধ করে দেয়। এসার দরিদ্র বাপ বাধ্য হয়ে ঘরের পিছনের পুকুরের পানির উপর দিয়ে বাঁশের সাকো নির্মা করে ঘরে আসা যাওয়া করত। আমার শ্বশুর তাদের উপর এই অত্যাচার দেখে দারু মর্মাহত হন। তিনি বড় রাস্তার পাশে এসার বাপকে বেশকিছু জমি বিনামূল্যে দান করে দেন। বাড়ি নির্মা করে এখন তারা সেখানে বসবাস করছে।

ডাঃ আহমেদুর রেজা চৌধুরী তখন ছিলেন সিলেটের সিবিল সার্জন। তিনি আমার শ্বশুর এনামউদ্দিন চৌধুরীর একমাত্র ভাগনা। একই গ্রামের পাশের বাড়িতে আমার ফুফু শ্বাশুড়ির বিয়ে হয়। এই ফুফা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। এই ভাগ্নাকে তিনি তার সন্তানদের সাথে লেখাপড়া করান। পরে তিনি সিলেট মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান। 

আমার শ্বশুরের উপর তখন হোস্টেলে অবস্থান করে পড়াশুনারত তিনপুত্র ও এককন্যা সন্তানের খরচের তীব্র চাপ ছিল। তিনি ছিলেন একজন সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ ফুড কর্মকর্তা, সামান্য বেতন ও সাচানের জমির আয় দিয়ে কষ্ট করে সবকিছু সামাল দিতেন। এই ধরনের কঠিন সময়ে নানা বাড়তি মানসিক চাপ তাকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলে। সেই সময় তিনি কথা বলতেন খুব কমলোকজনের সাথে মিশতেন না ও একা একা ঘরকোনে অন্ধকারে থাকা পছন্দ করতেন। প্রায় ছয়মাস তিনি অফিসও করতে পারেননি। কোনমতে সরকারি চাকুরিটা আল্লাহর মেহেরবানিতে কি করে যেন রক্ষা পায়। লোকে বলত কেউ তাকে তাবিজ কিংবা যাদুটুনা করেছে। আমার শ্বশুড়িমা অনেক পীর ফকিরের কাছে বেশ দৌড়াদৌড়ি করেন। তারপর তিনি একসময় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেন। 

সাচানের তিন মাইল পুর্বে সুরমাপারের ঘোলাঘাট গ্রামে আমার শ্বশুরের দোসরা বোনের বিয়ে হয়, সেই ফুফা ছিলেন গ্রামের সরপঞ্চ। এনামউদ্দিন চৌধুরী নিজ কন্যাকে ডাক্তারি পড়ানোর সময় প্রায়ই বলতেন, আমার মেয়ে চিকিৎসক হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে, কারো কাছে সাহায্যের জন্য তাঁকে তাকে হাত পাততে হবেনা। প্রতিবেশী বোনের অংশের জমি ক্রয় করে সমুদয় টাকা পরিশোধ করে তিনি দ্বায়মুক্ত হন। আমি তাঁকে নিয়ে বিগত জরিপে মাঠফর্সা বের করি, তখন এই দ্বায়মুক্তি দলিল তিনি আমাকে দেখান। 

ডাঃ আহমেদুর রেজা চৌধুরী জীবনে সফল হন, বিভিন্ন জেলায় সিবিল সার্জনের দায়িত্ব পালন করে সবশেষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডিপোটি ডায়রেক্টার পদ হতে অবসর গ্রহণ করেন। ডাঃ আহমদূর রেজা চৌধুরী আমার বেগমের একমাত্র ফুফুতো ভাই, তিনি তাঁকে ইরা ভাই ডাকতেন এবং তাঁর মনে ইরা ভাইয়ের প্রতি বেশ ভক্তিভরা টান ছিল। ডাঃ আহমেদুর রেজা ভাই ও রুবি ভাবী নানা মুখরোচক খাবার নিয়ে প্রায়ই বাসায় হাজির হতেন। রোগশয্যায় শায়িত মামার কাছে যেতেই হাত বাড়িয়ে ভাগনাকে জড়িয়ে ধরতেন। মামা ও ভাগনা দুইজনের চোখ বেয়ে নেমে আসে মিলনের অশ্রুধারা। 

২০০২ সাল, গলনালী বন্ধ হয়ে কৃত্রিম তরল খাবারে টিকে থাকা ও ক্রমান্নয়ে ঝিমিয়ে পড়া একজন রোগীকে নিয়ে এক দারুণ যন্ত্রণার মধ্যে আমাদের সময় পার হয়জানুয়ারি ২০০৩ আসে, শ্বশুরের শরীরে সবকটা কঙ্কাল তখন গোনা যেত। আগে তাঁকে বাথরুমে নিয়ে যেতে আমাদের কষ্ট হলেও এখন ওজনহীন হয়ে পড়ায় কোলে তুলেও হাই কোমডে বসাতে তেমন বেগ পেতে হতনা। জানুয়ারির শেষ সাপ্তাহে তার কষ্ট ও অস্থিরতা বাড়তে থাকে। আমি শুক্রবার জরুরি কাজে বাড়ি যাই, ফিরে আসি বিকেলে। এসে দেখি তিনি খুব বেশি ছটফট করছেন। আমাকে একবার বসাতে বলেন, বসালে আবার শোয়াতে বলেন। আমি তার পাশে থেকে বেশ কয়েকবার তাকে উঠবস করাই। 

সেদিন ছিল ৩০ জানুয়ারি ২০০৩ সাল। এইদিন রাত ১১ ঘটিকার সময় ৪৬, কাজলশাহ বাসায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৩০ সালে যাত্রা শুরু করা এই সহজসরল জীবন প্রায় বাহাত্তুর বছর, জন্মভূমি সাচান, নানাবাড়ি রণকেলি দিঘিরপার এবং সিলেট বিভাগের চারটি জেলাশহরের কর্মক্ষেত্রে বিচরণ করে করে সবশেষে এই সিলেট শহরে অবসর কাটিয়ে নিভৃতে ঝরে যান। 

কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন আমার পত্নী ডাঃ নুরজাহান বেগম, তিনি জন্ম হতে কোনদিন পিতামাতার স্নেহচ্ছায়া হতে কখনও বিচ্ছিন্ন হননি। নুরজাহান বেগম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবার পর প্রথমদিকে মেডিকেলের পড়ালেখা খুব কঠিন মনে হয়। বাবা তখন প্রতিদিন দিলরুবা হোস্টেলে গিয়ে কন্যাকে সাহস দিতেন। সিনিয়র ক্লাসের ছাত্রী ডাঃ আজমা আপার স্বামী ডাঃ ইকরাম ভাই প্রায়ই তাকে আসতে দেখে বলতেন, চাচা কোন চিন্তা করবেন না, মেডিকেল পড়া প্রথম প্রথম কঠিন মনে হলেও তা আস্তে আস্তে সহজ হয়ে যায়। ডাঃ আজমা বেগম আপাও আজ নেই। মরণব্যাধী স্থন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি অল্প বয়সে পরলোকে পাড়ি জমান। 

আমাদের পাশের বাসার ভদ্রলোক মদরিস আহমদ তরফদার একজন পরোপকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি পিডিবিতে চাকুরি করতেন, ছিলেন শ্রমিক ইউনিয়নের গণ্যমান্য নেতা। তিনি আমাদের পরিবারে সিপার বাপ নামেই পরিচিত। সারাটা রাত সজাগ থেকে তিনি আমার শ্বশুরের লাশের কাছে বসে দোয়া দুরুদ পাঠ করেন। তিনি কষ্ট করে আমার অনেকগুলো বৈদ্যুতিক মিটার বের করে দেন। তার পুত্র তানভীর আহমদ তফাদার রোমন আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিসিএস ক্যাডার। 

আমি দরগামহল্লায় গিয়ে মুফতিবাড়ির ফুফুতো ভাইয়ের সহায়তায় শাহজালালের দরগাহ মসজিদের পিছনে টিলার গায়ে একটি সুন্দর জায়গায় কবর খোদাই করি। পাশের কবরের এপিটাফে লিখা ছিল দেওয়ান আব্দুর রব চৌধুরী, প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী, পাকিস্তান সরকার।  বাড়িতে ফোন করে তাঁর নাতি মনুমিয়াকে একটি বড় বাস ভাড়া করে তার জন্মগ্রাম সাচানের আত্মীয় স্বজনদেরকে সিলেটে নিয়ে এসে জানাজায় শরিক হতে বললাম। বাদ আসর জানাজা শেষে তাকে হজরত শাহজালালের(রঃ) দরগায় দাফন করা হল। আমি কবরে নেমে লাশ নিজহাতে মাটিতে শায়িত করে দেইএই সময় আজিজ ভাই সপরিবারে সিলেটে হাজির ছিলেন। 

এনামউদ্দিন চৌধুরী মাতৃভূমি সাচান গ্রামে পাঠশালার পাঠ সমাপন করেন। চারখাইয়ে সেসময় ভাল বিদ্যালয় না থাকায় তিনি গোলাপগঞ্জ মোহাম্মদ চৌধুরী একাডেমিতে ভর্তি হন। তিনি খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। রণকেলি দিঘিরপারে মামাতো ভাইবোনদের সাথে থেকে এম সি একাডেমিতে লেখাপড়া করেন এবং ১৯৪৬ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। তাঁর মামাতো ভাইবোনরাও বেশ মেধাবী এবং ভাগ্যবান ছিলেন। এরশাদ আমল ছিল তাঁদের স্বর্ণযুগ। সেই সময় তাঁর মামাতো ভাই মেজর জেনারেল শফি আহমদ চৌধুরী বিজিবি প্রধান, মনু চাচা বিমান বাহিনীর উপপ্রধান, তজন চাচা বাংলাদের সরকারের সেক্রেটারি, টিয়া চাচা সেনাবাহিনীর মেজর, রসু চাচা পুলিশ সুপার ছিলেন। তাঁদের সন্তানরাও তখন পদস্ত সেনা অফিসার ছিলেন। তাঁদের একজন চিকিৎসক ভাগ্নি ডাঃ রেহানা চৌধুরী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম মহিলা মেজর জেনারেল হবার গৌরব অর্জন করেন। তসনু চাচার মেয়ে রূমা তখন সিলেট মেডিকেলে অধ্যয়ন করত। একই পাড়ায় বসবাসের সুবাদে তসনু চাচা সারাক্ষণ তাঁর অসুস্থ ফুফুতো ভাইয়ের পাশে ছিলেন। 

এনামউদ্দিন চৌধুরী নিজ সন্তানদেরেও যথাযথভাবে উচ্চশিক্ষিত করেন। জৈষ্ঠ্যপুত্র কবির আহমদ চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে গণিতে এমএসসি করে সরকারি ব্যাংকে চাকুরি পান। কিন্ত সুদের চাকুরিতে তাঁর তীব্র অনীহার কারণে শেষে অধ্যাপনায় যোগ দেন। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় আছেন। মধ্যম পুত্র জামিল আহমদ চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সাইন্সে এমএসসি করেন এবং ব্র্যাকের উচ্চপদস্ত অফিসার ছিলেন, তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলিনার কলম্বিয়া শহরে আছেন। কনিষ্ঠ পুত্র চুয়েট থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে প্রথমে জালালাবাদ গ্যাস ও পরে বাংলাদেশ ক্যামিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনে সরকারি চাকুরি করেন। তিনি বর্তমানে ঢাকা ও আমেরিকার কার্লিফোনিয়ায় বসবাস করেন। তাঁর একমাত্র ভাগনা ডাঃ আহমেদের রেজা চৌধুরী তখন সিলেটের সিবিল সার্জন ছিলেন। তিনি এবং রুবি ভাবী আমার শ্বশুরের জীবনের শেষদিনগুলোতে এসে খুব সেবাযত্ন করেন। 

এনামউদ্দিন চৌধুরী একজন সৎ ধর্মপরায়ণ মহানুভব মানুষ ছিলেন। মহান আল্লাহপাক তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের বাসিন্দা করুন, আমিন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন