একটি দুষ্টলোকের গালে চপেটাঘাত করার গল্পঃ
কদমতলি শাখায়
অবস্থানকালে ঘটে যাওয়া একটি বিশ্রী ঘটনার স্মৃতি আজও মনে পড়ে। একদিন দুপুরের পর
আমি অফিসের জরুরি কাজে সিলেট আঞ্চলিক অফিসে যেতে রিকশায় উঠি। রিকশাচালক একজন
অতিবৃদ্ধ লোক। আমার কেমন যেন খারাপ লাগছিল, এই বয়সে যে লোকটির অবসর নিয়ে একটু আরাম
আয়েশ করার কথা, সেই বয়সে জীবন বাঁচাতে
রিকশা চালানোর মত কঠিন পরিশ্রমের কাজ করছে। কিনব্রিজের সামনে ভীষণ যানজট। ঘর্মাক্ত
রিকশাচালক টেনে টেনে সেতুতে রিকশা তুলছিল, এমন সময় পিছন হতে একটি রিকশা অন্যায়ভাবে
বারবার আমাদের রিকশাটিকে ডিঙ্গায়ে সামনে যাবার চেষ্টা করে।
এই রিকশার
আরোহী একজন চেংড়া বয়সী লিকলিকে তরুণ। তরুণটির তিরিংবিরিং দেখে মনে হল কেমন যেন
একটা গুন্ডামাস্তানী ভাবসাব। আমার বুড়ো চালক রিকশা সাইড করে তাকে আগে যাবার
রাস্তা করে দিল। পাশদিয়ে এই রিকশাটি সামনে যাবার সময় লিকলিকে অল্পবয়সী আরোহী
তরুণটা আমার রিকশার বুড়ো চালককে সজুরে লাত্থিমেরে বসে। আমার রাগ সপ্তমে চড়ে বসে।
আমার চালককে বললাম, রিকশাটি দ্রুত সামনে নিয়ে যাও।
পাশাপাশি
হতেই তরুণটাকে বললাম, তর বাপের বয়সী লোক, তুই কেন এই মুরব্বি লোকটাকে লাথি মারলি?
সে উদ্যত
ভাষায় বলল, তুমি কে? মেরেছি, ভাল করছি। সে আমার রিকশাকে পথ ছেড়ে দিচ্ছেনা, তাই
লাথি দিয়েছি।
বললাম, তর
পা খুব বেশী লম্বা হয়ে গেছে?
আমাকে ভয়
দেখাতে সে গর্বভরে বলল ‘আমার বাড়ি বলদি’।
রাগে
হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অমনি আমি ‘হারামজাদা বলদির বলদ’ বলেই তার গালে প্রচন্ড জুরে
একটি চপেটাঘাত বসিয়ে দেই।
তারপর
হুঙ্কার দিল আমি ছাত্রদলের নেতা, দেখে নেব। আবার দিলাম আর
কয়েকটি চপেটাঘাত। দেখলাম ওর শরীরে তেমন কোন শক্তি নেই, এযেন শূন্য কলসীর ঝনঝন। মনে হল সে একটা রোগা নেশাখোর।
দুটি রিকশা একসাথে সেতুর ডাউনে নামছে। দেখলাম মারমুখী হয়ে তরুণটি দৌড়ে সুরমা মার্কেটে ঢুকছে ও তাঁর পরিচিত লোকজন জড় করার চেষ্টা করছে। আমি দশবার জন পুলিশের একটি বড় দলের সামনে পড়ি। রিকশাটি থামিয়ে বুদ্ধি খাটিয়ে পুলিশকে বললাম, আমি আপনাদের সাবেক আইজিপি জনাব ই এ চৌধুরীর চাচাতো ভাই। দক্ষিণসুরমার এমপি শফি চৌধুরীও আমার ভাই। এই লাফযাফকারি বেয়াদবটা এই বুড়ো রিকশাচালককে লাথি মেরে বসে, তাই ওকে আমি একটা থাপ্পড় মেরেছি। আমার বুড়ো রিকশাচালকও পুলিশকে সাক্ষী দিল। পুলিশরা আমার কথা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে এবং মহান আল্লাহর অপার মেহেরবানিতে পুরো পুলিশ টিম আমার পক্ষে দাঁড়ায়। পুলিশের তাড়া খেয়ে বিরোধীরা সবাই দৌঁড়ে পালায়। মনে হল দয়াময় আল্লাহ পাক আমাকে সসম্মানে বিজয়ী করতে যেন রহমতের ফেরেস্তা হিসাবে এই পুলিশের দলকে এখানে আমার পাশে পাঠিয়েছেন।
পরদিন অফিসে গমনকালে পুলের মুখে নামলাম। সুরমা মার্কেটের সামনে বসা একজন পানবিড়ি বিক্রেতাকে বললাম, গতকাল বিকেলে এখানে লাফালাফি করা লোকটা কে? সে বলল, এ একটা খাবিশ, ওপারে কোথায়ও তার বাড়ি। একজন বুড়া রিকশার ড্রাইভারকে মেরে ওপারের এমপির ভাইয়ের হাতে থাপ্পড় খেয়ে চিল্লাচিল্লি শুরু করে। খাবিশটা পিছনে তার পরিচিত এক দোকানে বসে প্রায়ই আড্ডা দেয়।
তবে দেখলাম এই পানদোকানী আদৌ চিনতে পারেনি গতকালের সেই ঘটনার পার্শ্বচরিত্রের অভিনেতা ওপারের এমপির ভাইটা যে ছিলাম আমি চৌধুরী ইসফাক।
পরদিন ডানহাতে বেশ ব্যথা অনুভব করলে বেগম সাহেবকে গতকালের এই থাপ্পড় লাগানোর গল্প বললাম। আমার পত্নী ডাঃ নুরজাহান বেগম এই বীরত্বের কাহিনী শুনে খুশি হতে পারলেন না। পাশে বসা শ্বাশুড়ী মালেকা খাতুন শুনে বেশ রাগ করলেন। বললেন পথেঘাটে যাই ঘটুক না কেন তাতে তুমি কেন জড়াতে যাবে। তুমি আর কখনও এসব করনা, নতুবা রাস্তাঘাটে কোথায়ও দুষ্টলোকদের হাতে হঠাৎ বেইজ্জত হয়ে যাবে।
আমি বললাম আমারতো তেমন রাগ নেই, এমনটি কখনও হয়না, কাল কেমন করে যেন ক্রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন তাদেরকে কথা দিলাম- এমনটি আর কখনও হবেনা, এটাই প্রথম এবং এটাই শেষ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন