একনজরে
সুমানবী ডাঃ নুরজাহান বেগম চৌধুরী শাহরিনঃ
জনক ও জননীর একমাত্র কন্যা, তিন উচ্চশিক্ষিত ভাইয়ের একমাত্র কনিষ্ঠ বোন ডাঃ নুরজাহান বেগম চৌধুরী ১৯৬৫ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি সুনামভরা সুনামগঞ্জ শহরের উকিলপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা এনাম উদ্দিন চৌধুরী তখন সুনামগঞ্জের ফুড অফিসে চাকুরী করতেন। তার ডাকনাম শাহরিন। শৈশবের চার বৎসর কাটে জলতরঙ্গের নিরিবিলি শহর সুনামগঞ্জে। শৈশবের শাহরিন ছিলেন নাদুসনুদুস মেয়েশিশু। স্থুলদেহ বাবা এনামউদ্দিন আদর করে মেয়েকে কোলে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করতেন। তাঁর সুনামগঞ্জের ভাগনারা দুষ্টামী করে বলতেন, ভেটকা মামুর ভেটকা ফুড়ি। একবার সুনামগঞ্জের বাসার পাকঘরে একটি গুঁইসাপ ঢুকে যায়। ছোট্ট শিশু শাহরিন গুঁইসাপ দেখে ভয়ে চিৎকার দিয়ে সবাইকে জড় করে ফেলেন।
পিতা এনাম উদ্দিন চৌধুরী ১৯৬৯ সালে মৌলভীবাজার বদলি হন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে তিনি চলে আসেন সৈয়দ শাহমোস্তফার পুণ্যভূমি মৌলভীবাজার শহরে। এখানে মুসলিম কোয়ার্টারের এক বড় বাসায় তার কিশোরীবেলা পার হয়। বাসাটি আমি তাকে নিয়ে একদিন গাড়ি ড্রাইভ করে দেখে আসি। একটি সুন্দর পুকুরওয়ালা মসজিদের ধারে পাকা প্রাচীরঘেরা বাসা। টিনের পাকাঘর, প্রচুর আম, জাম, কাটাল, নারকেল ও জাম্বুরা গাছের ছড়াছড়ি। একদম গ্রামবাংলার এক সাজানো বাগান বাড়ি। বাড়ির মালিকেরা থাকতেন রাজধানী ঢাকায়।
হাফিজা খাতুন প্রাইমারী স্কুলে তার শিক্ষাযাত্রা শুরু হয়। প্লে ওয়ান হতে ক্লাস থ্রি পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসে বার্ষিক পরীক্ষায় ফাস্ট হন। এবার ভর্তি হন এই শহরের আলী আমজদ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ক্লাস ফোরে। ফাইন্যাল পরীক্ষায় প্রথম হলে ক্লাস টিচারদের নজরে পড়েন ও ক্লাস ফাইভে টেলেন্টপুল গ্রেডে বৃত্তি পান। টিচাররা ভাল ছাত্রী হিসাবে তাকে স্নেহ করতেন ও নিচের ক্লাসে পড়াতে নিয়োগ করতেন। তিনি সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে পিতা এনাম উদ্দিন চৌধুরী সুনামগঞ্জ শহরে বদলী হয়ে যান। আলী আমজদ বালিকা বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণির পাঠ অসমাপ্ত ফেলে রেখে তিনি পরিবারের সাথে তার জন্মস্থান সুনামগঞ্জে ফিরে যান এবং সুনামগঞ্জ সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের একই সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এখানেও ক্লাস সমাপনী পরীক্ষায় দীর্ঘদিন হতে ফাস্ট হওয়া একজন ভাল ছাত্রীকে ডিঙ্গায়ে প্রথম হন। টিচাররা কোন ছাত্রীটি ক্লাসে ফাস্ট হল খোঁজতে গিয়ে আবিস্কার করেন কিছুদিন আগে ভর্তি হওয়া অজ্ঞাত মেয়ে নুরজাহান বেগম ফাস্টগার্ল হয়ে গেছেন।
সপ্তম শ্রেণির
পাঠ সমাপ্ত হলে এবার গৃহকর্তার হবিগঞ্জ শহরে বদলির আদেশ আসে। এবার সবাই ছুটলেন
সিলেট বিভাগের বুনেদী শহর খোয়াইপারের হবিগঞ্জ। এখানে এসে নুরজাহান বেগম হবিগঞ্জ বি কে জি সি গার্লস
স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এখানে নবম ও দশম শ্রেণি
পড়ে ১৯৮০ সালের এস এস সি (বিজ্ঞান) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে গণিত
ও বিজ্ঞানের সব বিষয়ে লেটারমার্ক পেয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।
এবার ভর্তি হন হবিগঞ্জ সরকারি বৃন্দাবন
কলেজে। ১৯৮২ সালের এইচ এস সি (বিজ্ঞান) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে গণিত,
পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়ন, এই ছয়টি বিষয়ে লেটারমার্ক পেয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ
হন।
অতি মেধাবী
ছাত্রী ডাঃ নুরজাহান বেগম চৌধুরী শাহরিন একসাথে বুয়েট ও মেডিকেল কলেজ এই দুইটিতেই ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ
হন, তবে সবার পরামর্শে মেডিকেল কলেজকেই বেছে নেন। পরবর্তীকালে
তিনি বলতেন, মেডিকেলে গণিত নেই, কেবল মুখস্ত পড়া, আমার গণিতে যে অগ্নিমেধা ছিল, বুয়েটে
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লে হয়ত অনেক ভাল ফলাফল করতে পারতাম। তার প্রধান উপদেষ্টা মেঝভাই জামিল আহমদ চৌধুরী বললেন, মেয়েদের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার চেয়ে মেডিকেল পড়াই উত্তম।
শেষে তাই কার্যকর হল। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত অধ্যাপিকা
দিলরুবা বেগমের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘দিলরুবা হোস্টেল’ এর ২০২ নং কক্ষে তাঁর ঠাঁই হল। প্রিয় বান্ধবী হবিগঞ্জ বি কে
জি সি গার্লস স্কুল এবং বৃন্দাবন কলেজের সহপাঠিনী, হবিগঞ্জের মেয়ে ডাঃ দিলরুবা বেগম
লিজু এই হোস্টেলে ছিলেন তার রুমমেট। দিলরুবা লিজু এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপিকা। ডাঃ
আফরোজা বেগম শিলা, ডাঃ জেসমিন, ডাঃ শাখাওত, ডাঃ শামিম, এম পি ইসমত চৌধুরীর কন্যা
ডাঃ নাজরা, ডাঃ তৃপ্তি, ডাঃ পলি, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শহীদ সৈয়দ নজরুল
ইসলামের কন্যা ডাঃ লিপি, ডাঃ আমেনা শফিক এমপি, ডাঃ বিল্পব কুমার, ডাঃ হিমাংশু, ডাঃ এমাদ সুহেল, বৃন্দাবন কলেজের সহপাঠী কামরুল আক্তার প্রমুখ এখানে তাঁর সহপাঠিনী ছিলেন। ডাঃ লিপির ভাই সৈয়দ আশরাফ
বাংলাদেশ আওয়ামি লিগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ছিলেন। সৈয়দ আশরাফ মারা
গেলে তাঁর বোন ডাঃ লিপি এই আসনের এমপি নির্বাচিত হন। আমার পত্নী ডাঃ নুরজাহান
সর্বদা ডাঃ সৈয়দা জাকিয়া নুর লিপির প্রশংসা করতেন। ১৯৮৯ সালে সিলেট সরকারি মেডিকেল কলেজ হতে তিনি চিকিৎসক হয়ে বেরিয়ে আসেন। নুরজাহান বেগম চৌধুরী সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের
২১তম ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন। এই ব্যাচে ছিলেন ১৫০ জন শিক্ষার্থী। তাঁরা সবাই একে অন্যের জন্য অন্তপ্রাণ। আজও তাঁদের মধ্যে ছাত্রজীবনের সেই মায়ার বন্ধন অটুট রয়েছে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন