বিস্মৃত অক্ষরে একটি বিয়ের না বলা উপখ্যানঃ
যৌবনের পরশ পাওয়ামাত্র মানুষের স্বপ্নরাজ্যে আনাগুনা শুরু করে তার মানসী প্রতিমাদেবীর সোনালি ছবি। সেই স্বপ্নদেবী হবেন স্মার্ট, সাদাঙ্গিনী, দারুন সুন্দরী ও উত্তম মানবী। সেই ভাবনা সবার মত আমাকেও আহরাত্র তাড়িয়ে বেড়াত। ২৯ জানুয়ারি ১৯৯৩ অগ্রজ তাহমিদ চৌধুরীর শুভ পরিণয় সমাপ্ত হলে সিরিয়ালে আমার পালা আসে। আমাদের সিলেট অঞ্চলে সুন্দরী মেয়েদের ঠিকানা হত প্রায়ই বিদেশে। অবশিষ্ট সুন্দরীরা চলে যেতেন ধনী ব্যবসায়ী ও ভাল চাকুরীজীবীদের ঘরে। আমি বড় চাকুরীজীবী কিংবা ধনীর দুলাল কোনটাই নই। সিলেট শহরের ছয়সাত মাইল দূরের দাউদপুর গ্রামে জমিজামাসহ বড়বাড়ি থাকলেও সিলেট শহরে কিছুই ছিলনা। সমাজসেবক ক্রীড়ানুরাগী আব্বা সফিকুর রহমান চৌধুরী তেমন বৈষয়িক লোক ছিলেন না। টাকার পিছনে ছুটাছুটি করা ছিল তার নীতিবিরুদ্ধ কাজ। বলতেন, বেশি টাকা দিয়ে কি হবে, একদিন সব ফেলে চলে যেতে হয়। মানিব্যাগে কিছু টাকা থাকলেই হল যাতে দিনখরচটা মিঠে যায়। আমি কখনো সঞ্চয় করিনি, মানিবেগে যে দুই চার পাঁচ শত টাকা আসে, তাই দিয়ে স্বাচ্ছন্ধ্যে জীবন কাটিয়ে দিয়েছি।
বিয়ের বাজারে পুরুষ মানুষের সুন্দর চেহারা ও উচ্চ ডিগ্রির তেমন কোন মূল্যবহন করেনা, যদিনা থাকে তার অর্থবল। বংশমর্যাদা তখনও কিছুটা মুল্যবহন করলেও এখানে একটু আধটু ছাড় দিয়ে সুবিধা নিতে আমার পিতার ছিল নিদারুন অনীহা, কারণ তিনি বৃটিশ আমলের ১৯১৬ সালের জাতক। অগ্রজ তাহমিদ চৌধুরী লন্ডনে চলে গেলে মায়ের মনোভাব বিবেচনা করে আমি দেশে থাকার এক অলিখিত সিন্ধান্ত ইতিমধ্যে নিয়েই ফেলি। তখন মাবাবার অনেক বয়স হয়ে গেছে। তাই তাদেরকে ফেলে রেখে বিদেশে চলে যেতে মন তেমন সম্মতি দিলনা।
গ্রামের মানুষের কাছে এক হাসির গল্প শুনতাম, কোন এক গ্রামে হাবলূ নামক একজন হাবাগোবা বেকার যুবক বসবাস করতেন। তাকে একপাশে ফেলে রেখে ভাইরা সবাই একে একে বিয়ে করে সংসারী হন। প্রথা ভেঙ্গে সিরিয়াল ডিঙ্গায়ে অনুজরাও বিয়ের দিল্লিকা লাড্ডুর স্বাধ নেয়। লোকে বলল হাবলু মিয়া, এটাত দারুন অন্যায় যে তোমাকে ফেলে রেখে তোমার ছোটরাও দিল্লিকা লাড্ডুর মজা লুটছে আর তুমি শুয়ে শুয়ে আঙ্গুল চুষছো। হাবলু বলল, কি করব আমি, বড়রা যে আমার অন্তরের যন্ত্রণা আদৌ বুঝতে চায়না, তারা সবাই বিয়ে করছে, কিন্তু আমাকে বিয়ে করার কোন সুযোগ করে দিচ্ছেনা। এবার প্রতিবেশীরা হাবলুকে কানে কানে কি এক উপদেশ দিয়ে বিদায় নিল।
পরদিন হাবলু একটি বড় সিজর দিয়ে তার বিছানা ও চাদর মাঝামাঝি কেটে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে। বড়রা এসে বললেন হাবলু তোমার মাথা কি পাগল হয়ে গেছে, তুমি এসব কি করছ? হাবলু জবাব দিল আমি একা মানুষ, এত বড় বিছানা দিয়ে কি করব, আমার অর্ধেক বিছানাতেই চলবে। এবার বড়রা ভাবলেন তবে রে আচ্ছা, কে বলে হাবলুর বুদ্ধিসুদ্ধি নেই, এই হাবলুকে বোকা ভাবে, কোন সে বোকায়। তারপরও সবাই ভাবে হাবলুর চাকুরী নেই, টাকাকড়ি নেই, ওই হাবাগোবাটা বউ পালবে কেমনে? ঘনঘন বাচ্চা হলে তাদেরে টানবে কেডায়। কিছুদিন পর দেখা গেল হাবলু করাত চালিয়ে পালং কেটে দ্বিখন্ডিত করে ফেলেছে। ঘরের লোকজন জড় হলে হাবলু বলল এত বড় পালঙ্কের আমার দরকার নেই, এত বড় পালঙ্কে একা একা আমার ঘুম আসেনা, তাই এই বড় পালঙ্ক কেটে দু টুকরো করে দিলাম। এবার অভিভাবকদের টনক নড়ল, সবাই ভাবলেন তাড়াতাড়ি একটা বিহিত ব্যবস্থা করতে হবে, নইলে হাবলু মিয়া হয়ত কুড়াল চালিয়ে এই ঘরটাই নাজানি একদিন কেটে দুই টুকরো করে দেবে।
অবশ্য হাবলু মিয়ার মত এত দুঃসহ অবস্থার মুখোমুখী আমাকে হতে হয়নি। আমি সিরিয়াল লাইনে দাঁড়ান আছি, সবার চেষ্টা তদ্বিরও চলছে। আমার অগ্রজের বিয়ের কিছুদিন পরই একজন অপরূপ সুন্দরী বিশ্বনাথী লন্ডনি কনে দেখান আমার এক ভাবী, কনে তার বোনের ননদ। সদ্য বড়ভাইয়ের বিয়ের ঝামেলা শেষে ক্লান্ত কারো মানসিক অবস্থা নেই আরেক বিয়ের ঝামেলায় জড়ানোর। তাই বিনা চাওয়ায় বৃষ্টি নামার মত সহজে হাতে পাওয়া এই সর্বাঙ্গ সুন্দরী বিদেশিনীর সাথে আমার আর জোড় রচনা হয়নি।
নিউইয়র্ক ও লন্ডনে অনেক আত্মীয় সুন্দরীরা আছেন, কেউ কেউ উপদেশ দেন নিজঘরে রত্ন রেখে বাইরে কেন রত্ন খুঁজবেন, এসবে ডুব দেন। হে বর ভাণ্ডারে তর, বিবিধ রতন/ তা সবে অবোধ তুই, অবহেলা করি/ পরধন লোভে মত্ত, করিস ভ্রমণ/ পরদেশে ভিক্ষাবৃত্তি, কুক্ষণি আচরি। সবই বুঝলাম, কিন্তু সাত সমুদ্র তের নদী ওপারের হার্ডসন নদে কিংবা টেমসের জলে ঝাঁপ দেওয়ার উপদেশ বিতরণ করা যত সহজ, আসলে বাস্তবতা তত সহজ নয়।
আষাঢ় শ্রাবণে যখন বন্যা নেমে, চারপাশে থৈ থৈ করে ভাসান জল, অথচ তখন তৃষ্ণা মেঠাবার মত জল মেলেনা। আপনি যেই নামলেন তো কনের খোঁজে, অমনি বেশুমার কনেভরা দুনিয়ায় কনের অকাল দুর্ভিক্ষ লেগে গেল। তখন বুঝা যায়, কেন লালন মরল জল পিপাসায়, কাছে থাকতে নদী মেঘনা। কেন হাতের কাছে ভরা কলস তৃষ্ণা মিঠেনা।
এবার একজন স্বেচ্ছাসেবী হুজুর এসে সওয়াব হাসিলের আশায় আমার কনের খোঁজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি মৌলানা সফিকুল ইসলাম, তার বাড়ি রেঙ্গা মাদ্রাসার দেড়দুই মাইল পূর্বের এক অগাধ ভাটি গ্রাম সাদতপুর। জলে থৈ থৈ করে, মেঠো রাস্তা, রিকশা যায়না, হেঁটে গেলে পদযুগল ঠনঠন করে। হুজুর নিজের খেয়ে, নিজ খরচে আমার কনের খোঁজে গলদঘর্ম হন। কোনদিন টাকা দিলে নিতেন না, বলতেন দুইজন নরনারীর মধ্যে বিয়ে করিয়ে দেওয়া খুব সওয়াবের কাজ, একাজে আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা খুব খুশি হন। আমি যদি আপনার কাছ থেকে টাকা নেই, তাহলে সেই সওয়াব আর থাকবেনা। আব্বার দারুন ভক্ত এই সফিক মৌলানা হুজুর মৌলভীবাজার শহরের কোন এক মসজিদে ইমামতি করতেন। তার কনে খোঁজার উৎস মৌলভীবাজার।
তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে বর দেখাতে একবার মৌলভীবাজারের জগতপুর গ্রামের এক লন্ডনি কনের বাবাকে দাউদপুর নিয়ে আসেন। আমাদের বাড়ির সামনে এসে গাড়িটি বাড়ির দিকে মুখ করামাত্র স্টাট বন্ধ হয়ে যায়। কনের বাবা ধরে নিলেন এটা অশুভ লক্ষণ। মেহমানরা খেয়েদেয়ে বিদায় নেন, এখানেই নাটকের ইতি ঘটে।
সফিক মৌলানার কনে খোঁজায় অস্থিরতা চলল। বেশ কয়েকজন কনের অভিভাবককে তিনি ধরে বেঁধে নিয়ে আসেন। আমাকেও মাঝে মাঝে কলার ধরে টেনে নিয়ে তিনি কিছু কনের দরবারে হাজির করেন। আমি বিরক্ত হলেও এতে তাঁর কিছু যায় আসেনা। তিনি গায়ে পড়ে নিজের খেয়ে পরোপকার করেই ছাড়বেন। বিয়া কররার খবর নাই, স্বেচ্ছাসেবী ঘটক সফিক মৌলানার ঘুম নাই। তাঁর পাল্লায় পড়ে আমার অবস্থা শোচনীয়, ছেড়ে দে মা, পালিয়ে বাঁচি।
সফিক মৌলানা বলতেন, আল্লাহর রাসুল(সঃ) বিয়ের ব্যাপারে মেয়ের বংশমর্যাদা ও ধার্মিকতাকে প্রথমে আমলে নিতে বলেছেন। মেয়ের রূপ ও অর্থকে তারপরে স্থান দিয়েছেন। পাগলাটে সফিক মৌলানা কনেদের মুল্য নির্ধারণে একটা ডিজিটাল হিসাব পদ্ধতি আবিস্কার করেন। তিনি কনের বংশ মর্যাদায় ২০০, আমল খাসলত ২০০, রূপ সৌন্দর্য ১০০, শিক্ষাদীক্ষা ১০০ ও আর্থিক অবস্থাসহ অন্যান্য ১০০ নম্বর ধরে তার তালিকায় থাকা কনেরা কে কোন বিষয়ে কত নম্বর পাবে, হিসাব করে বের করেন। এই সর্বমোঠ ৭০০ নম্বরের মধ্যে যে কনেরা বেশি নম্বর পাবেন তারা হবেন সেরা কনে।
তিনি এই সুক্ষ পদ্ধতিতে হিসাব কষে কষে আমার জন্য মৌলভীবাজার এলাকার বেশ কিছু ভাল নম্বর পাওয়া কনের সন্ধান নিয়ে আসেন। এই কনেদের পরিচিতি সৈয়দ ইয়াওর মিয়ার নাতিন, হাজি মুছা কলিমুল্লার ভাতিজি, আফতাব উদ্দিন কৌরি সাহেবের কন্যা, ডাঃ আব্দুল হকের ভাগ্নি ইত্যাদি। কিন্তু সমস্যা হল হুজুরের চোখের আন্দাজে প্রদত্ত এই নম্বার আসলে কতটা সঠিক ও বাস্তব তা আদৌ বলা যায়না। তবে পাগলা সফিক মৌলানার এই হিসাব পদ্ধতিকে অবশ্য পরে আমি কনে নির্বাচনের কাজে লাগাই।
মাওলানা সফিকুল ইসলাম ছিলেন সে সময়ের এক অতি চিত্তাকর্ষক পুরোহিত চরিত্র। কালো দাড়িগোঁফ ও আধা কাঁচাপাকা চুলের মৌলানা সাহেব চোখে সুরমা দিতেন। তার বিশ্বাস হজরত মুসা (আঃ) তুর পাহাড়ে আল্লাহর সাথে কথা বলতে গেলে আল্লাহ পাকের নূরের তজল্লি সহ্য করতে না পেরে ঐ পাহাড়টি পুড়ে যায়। এই পূড়ে যাওয়া পাহাড়ের গুঁড়ো হলো সুরমা। তাই সুরমায় চোখ ভাল হয়। তিনি বলতেন চোখে সুরমা লাগানো আমাদের রাসূল(সঃ) ছাড়াও আগের জামানার আর বেশ কয়েকজন নবি রাসুলের সুন্নাত।
পাকিস্তান আমলে তাঁর ধারকাছের সব আলেমরা পাকিস্তানপন্থী হলেও সফিক মৌলানা ছিলেন একজন দলছুট স্বাধীনতা প্রেমিক। তিনি গর্বভরে বলতেন আমি স্বাধীনতাপন্থী আলেম, একেত্তুরের স্বাধীনতা যুদ্ধে আলেম উলামারা সবাই পাকিস্তানের দালালি করেছে, একমাত্র আমি সফিক মৌলানা দালালি করিনি। আমি মনপ্রাণ সঁপে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া হাতেগোনা আলেমদের মধ্যে আল্লাহপাকের এই বান্দাহ একজন। আমার নেতা বাঘের বাচ্চা বংগবন্ধু শেখ মুজিব।
আমার কনে খোঁজা অভিযানে তার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও একাজে তার আন্তরিকতার বিন্দুমাত্র ঘাটতি ছিলনা। তার মাথার মধ্যে কিছু একটা ঢুকে গেলে সবকাজ ফেলে রেখে তিনি সেইকাজে লেগে যেতেন। তার চিন্তা ভাবনার সারাটা অংশ জুড়ে এই একই চিন্তা সারাক্ষণ ঘুরপাক খেত। আমি তাঁকে কনে খুঁজতে একসময় নিষেধ করি, কিন্তু কে শুনে কার কথা। তিনি মনে করতেন রেঙ্গার পরগনার বিখ্যাত চৌধুরী বংশের সর্বজনের পরম শ্রদ্ধাভাজন সফিকুর রহমান চৌধুরী ওরফে দলুমিয়া স্যারের ছেলের এই সামান্য উপকার করে দিলে তিনি দীন ও দুনিয়ায় ধন্য হবেন। তাই মৌলভীবাজার মসজিদের সানি ইমামের হাতে নামাজের দায়িত্ব সঁপে দিয়ে জনাব সফিক মৌলানা আমার কনের খোঁজে হৈন্য হয়ে এদিক ওদিক দৌঁড়াতেন।
সফিক মৌলানা সিলেটের লোয়ারপাড়ার দেওয়ান ইকবাল মামাকে নিয়ে একবার ভাসান বন্যায় ভেসে তাঁর ভাটিগ্রাম সাদতপুর ছুটলেন। লন্ডনি ইকবাল মামার লালকারের উপর আমরা বায়ুভর্তি স্পিডবোর্ট দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেওয়ান মঞ্জিল হতে রওয়ানা হই। বৃটেনে বড় হওয়া বেঁটে দেওয়ান ইকবাল আহমদ চৌধুরী মামা হাফপ্যান্ট পরে নিজে কার চালিয়ে রেঙ্গা হাজিগঞ্জ যান। ভাসান বন্যার থৈ থৈ জলভরা খালেবিলে স্পিডবোর্ট চালিয়ে অতিকষ্টে আমরা পাগলা সফিক মৌলানার বাড়ি সাদতপুরে পৌঁছি। কষ্টের কারণ স্পিডবোট চালাতে ইঞ্জিনের ফ্যানে বারবার শ্যাওলা লেগে যায়। সফিক মাওলানা গরিব মানুষ, তা সত্বেও লোকের দয়াদক্ষিণায় পাওয়া দুইচার টাকা জমায়ে গ্রামে টিনবাঁশের একটি মক্তব করেছেন। আমাদেরে দেখে জনকয়েক আধা ন্যাংটা শিশুর দল সজুরে সালাম দেয়।
১৯৮৬ সালের এক হাটবারে সফিক মৌলানাকে মোগলাবাজারে আমার ফুফুতো ভাই স্বতন্ত্র সাংসদ প্রার্থী আলহাজ্ব শফি আহমদ চৌধুরীকে জেতাতে জনগণের পায়ে ধরে ধরে ভোট ভিক্ষা চাইতে দেখি। আসলে তিনি ছিলেন দাউদপুর চৌধুরীবংশের একজন শুভাকাংখী, একনিষ্ঠ ভক্ত ও সমর্থক। তিনি ভাটির লোক, খুব হাঁটতেন। হাঁটা ছিল এই আর কি? তিনচার মাইল হেঁটে প্রায়ই দাউদপুর এসে হাজির হতেন।
বিগত বহুবছর ধরে আমার হিতৈষী এই বিচিত্র চরিত্রের বন্ধুমানুষ ইমাম সফিকুল ইসলামের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। তিনি আছেন, নাকি মারা গেছেন, তাও জানিনা। মহান আল্লাহ এই উদার নিঃস্বার্থ সত্যবাদী সাদাসিদা মানুষটির মঙ্গল করুন। এই দুইনম্বরি দুনিয়াকে বদলাতে হলে আজকের দুঃসহ দিনে বাংলাদেশে সফিক মৌলানার মত সৎ বিশ্বস্ত ও ভাল লোকজনের খুবই প্রয়োজন।
কদমতলীর ব্যবসায়ী আব্দুল আহাদ ভাইয়ের বাড়ি মুমিনখলা। তিনি আমার আরেকজন হিতাকাংখী, তিনি আমাকে তার একজন সুন্দরী লন্ডনি ভাগ্নী দেখান। কিন্তু আল্লাহ পাক না মারলে জোড়, মক্কা থাকে যোজন যোজন দূর। রড সিমেন্ট ব্যবসায়ী আহাদ ভাই গল্পবাজ লোক। অতিরঞ্জনে ভরপুর তার গল্পগুলো হয়ে যেত ‘লাখে লাখে সৈন্য মরে কাতারে কাতার,/ গুণিয়া দেখা যায় দুইচার হাজার’।
রনকেলি গ্রামের রাকু আপা একদিন বললেন, বেয়াই সাব, আমার আত্মীয় একজন ভাল কনে আছে। আমি আলাপ দিয়ে দেখি। কে কনে, কি করে, কি পড়ে, কোনকিছু না জেনেই বললাম দেখুন। পরে জানতে পারি শাহজালাল উপশহরের একজন ধনাঠ্য ডাক্তারনী রেহানা খানম চৌধুরীর একমাত্র সুন্দরী কন্যার জন্য তিনি বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিছুদিন পর রনকেলি গেলে ঘটক আত্মীয়া রাকু আপা বললেন, ওহে কুরেশী ভাই, এই মেয়েকে বিয়ে করলে তুমি নির্ঘাত বিপদে পড়বা। আমি বললাম কেন? তিনি জবাব দেন, তুমি হয়ত জাননা এই মেয়ের সাজগুজে প্রতিমাসে কি পরিমান অর্থ খরচ হয়, তা তোমার পুবালী ব্যাংকের বেতনের টাকায় সামাল দিতে পারবানা। তাই বিপদে ঝাঁপ না দিয়ে ভাই, এক্ষুণি চুপে চুপে সরে পড়, পালাও। তার কথায় মনে হল, মাবাবার একমাত্র সন্তান এই কনে একজন আলালের ঘরের দুলাল। ভাবলাম দিল্লিকা লাড্ডু কেঊ খেয়ে পস্তায়, আবার কেউ না খেয়ে পস্তায়। না হয় আমি, না খেয়ে পস্তানর দুসরা দলেই ছুটলাম। যেচে আলাপ, যেচে প্রস্থান।
মনে মনে ভাবলাম ভদ্রলোকেরা বিয়েতো জীবনে একবারই করেন। এখানে বিজয়ী হলে সারাজীবনের জন্য মানুষ যেমন ভাগ্যবান হয়, অনুরূপ হারলে সে আজীবনের জন্য ভাগ্যহতের তালিকায় নাম লিখায়। এযেন ভাগ্যের হারজিতের এক জুয়াখেলা। এই খেলায় নায়ক ও নায়িকা দুজনের একজন হারে তো অন্যজন জেতে। কিন্তু আমি ভাবলাম এই বাজিতে হারব না, আবার জিততেও যাবনা। এই খেলায় আমরা দুজনের খেলার ফলাফল হবে উইন উইন পজিশন। নায়ক এবং নায়িকা এককভাবে হারজিতকে পাশ কাটিয়ে দুইজনই সমভাবে একত্রে জেতা জিতবো। এবার আমি দুজন অর্বাচিন নায়ক নায়িকার সমভাবে বিজয়ী হওয়ার গল্প শুনাব।
একদিন শিবগঞ্জের বনলতায় ফুফুতো বোন সিরিয়া আপার বাসা যাই। সেখানে দুলাভাই হোসেন মিয়ার সাথে দেখা হলে তিনি বললেন, ওবা সেফাক মিয়া, তুমি চাকুরিতো একটা করতেছ, এখন বিয়েটিয়ে করো, সংসারী হও, এভাবে আর কতদিন একা একা থাকবা। আমি প্রতিউত্তর দিলাম কনে খোঁজে দেন, তাহলে বসে থাকতে হবেনা। তিনি বললেন আমার হাতে একজন কনে আছেন, তুমি অনুমতি দিলে দেখতে পারি। হোসেন আহমদ চৌধুরী দুলাভাইয়ের বোনের নিকটাত্মীয় এই কনে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হতে সদ্য এমবিবিএস পাশকরা একজন চিকিৎসক নুরজাহান বেগম চৌধুরী ওরফে শাহরিন। তিনি বললেন আয়শা ক্লিনিকে গিয়ে আগে কনে দেখে এসে আমাকে জানাও তারপর আমি বিয়ের আলাপ দেব। একদিন সিলেটের আয়শা ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসক কনের টেবিলের সামনের চেয়ারে বসে বললাম আমার একজন রোগি পিত্তপাথর অপারেশন করবে, ভর্তি হলে কেমন খরচ হবে, কতদিন ক্লিনিকে থাকতে হবে। এভাবে কিছু কথাবার্তা বলে চলে আসি। মনে হল সহজ সরল নিরহংকার মহিলা। পোষাক পরিচ্ছদে একদম সাধারণ। কথা বলেন মেপে মেপে, বুদ্ধিমত্তার চেয়ে সততার ধার বেশী। কনে ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারলেন না একজন পানিপ্রার্থী তাকে দেখে যাচ্ছে।
সেকালে ডাক্তার ছিল সোনার হরিণ। আজকের মত তখন এত এত বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ছিলনা, ফলে ডাক্তার তখনও লোহার হরিণে পরিণত হয়নি। এই আয়শা ক্লিনিকে চাকুরী করেন আমার মোগলাবাজার হাইস্কুলের ছাত্র গোপাল বাবু। সে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। গোপাল চক্রবর্তী বলল, স্যার নুরজাহান ম্যাডামকে বিয়ে করলে আপনার খুব ভাল হবে, আপনি সুখী হবেন, তিনি খুব ভদ্র ও ঠান্ডা মেজাজের লোক। পূবালী ব্যাংক সিলেট শাখায় আমার সহকর্মী গুরুজন সাদেক আহমদ শিকদার ভাই এই চিকিৎসক কনের একই পাড়ার প্রতিবেশী। তিনিও আমাকে এখানে পজেটিভ মতামত দিতে নানাভাবে বুঝাতে থাকেন। গোপাল বাবু ও সাদেক শিকদার ভাই এব্যাপারে আমার সিন্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবক হিসাবে কাজ করেন।
তখন আমার হাতে নানা ডায়মেনশনের বেশ কয়েকজন কনের তালিকা ছিল। আমি সফিক মৌলানার বর্ণিত অংক কষে প্রত্যেক কনের কোর নির্ণয় করি। এই কনের কোর নির্ণয় করতে গিয়ে ডাঃ নুরজাহান বেগম চৌধুরীর হিসাবে কনের বংশ মর্যাদায় ২০০তে ২০০, আমল খাসলত ২০০তে ২০০, রূপলাবণ্য ১০০তে ৫০, শিক্ষাদীক্ষা ১০০তে ৮০ ও আর্থিক অবস্থায়সহ অন্যান্য ১০০তে ৮০ নম্বর ধরে মোঠ ৭০০ নম্বরে ৬১০ স্কোর আসে। আমার হাতের নাগালে থাকা অন্যান্য অতিসুন্দরী কনেদেরও এত স্কোর আসেনা।
আমি আবেগকে কোন প্রশ্রয় দেইনি, মুল্য দেইনি প্রেমের ভাবাবেগেরও। আমার ভাবনা ফুলের কেবল রূপ থাকলেই চলবেনা, খুসবুও থাকতে হবে। বাস্তবের দাঁড়িপাল্লা দিয়ে মেপে ওজন করে কেউ বিয়ে করে কিনা জানিনা, কিন্তু আমি কনের মুল্য সফিক মৌলানার নিক্তিতে চুলচেরা মেপে একপা এগুই তো তিনপা পিছাই, এমন করে করে সুদীর্ঘ সময় পেরিয়ে, তারপর একদিন কেমনে কেমনে যেন এখানে বিয়ের লতাকুঞ্জে জড়িয়ে যাই। এযেন ছিল স্রষ্টার লিখন, বিধির লিখন কে করে খন্ডন?
হোসেন আহমদ চৌধুরী আমার ফুফুতো বোন ফাবিয়া খানম চৌধুরীর জীবনসঙ্গী। তিনি সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা, তার বাসা উঁচু পাহাড়ের উপর, খাদিম দাসপাড়ায়। ১৯৪৭ সালে তিনি ভারত হতে হিজরত করে সিলেট আসেন এবং এখন হিজরত করে যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। তিনি আমার অবৈতনিক ঘটক, নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ান, করেন শালার ঘটকালী।
একদিন মামাশ্বশুর সফিকুর রহমান চৌধুরীকে নিয়ে হোসেন দুলাভাই যান কনের বাসায়, ৪৬ কাজলশায়। কনের দুইভাই আজিজ আহমদ চৌধুরী ও কবির আহমদ চৌধুরী আব্বার পাছুঁয়ে দেন সশ্রদ্ধ সালাম, বৃদ্ধ পিতার (আমার শ্বাশুর এনামউদ্দিন চৌধুরী) প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য দেখে আব্বা মনে করলেন সুদর্শন উচ্চশিক্ষিত এই দুই ভাইয়ের একমাত্র চিকিৎসক বোন নুরজাহান বেগম চৌধুরী নিশ্চয়ই তাদের প্রতিরূপ হবেন। বিনয়ী কনে ডাঃ নুরজাহান বেগম এসেও পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধাভরে আব্বাকে সালাম নিবেদন করেন। কনে দেখতে এসে আমার আব্বা সফিকুর রহমান চৌধুরী একেবারে গলে যান, আব্বার মতামত হয়ে গেল সুদৃঢ় ও অটল।
পরদিন কদমতলী শাখায় আমার সামনে আসেন ছোট
সমনদিক বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার আজিজ আহমদ চৌধুরী জুয়েল। তিনি ঢাকার তেজগাঁও শিল্প
এলাকায় অবস্থিত ফারুক কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রির মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আমার
টেবিলের সামনের চেয়ারে বসে দুইচার ভালমন্দ কথা বলেই তিনি চলে যান। তারপর
কিছুদিন আগে শেষরাতে স্বপ্নে দেখি আমি লন্ডনের এক মেডিকেল কলেজে পড়ছি। স্বপ্নের মধ্যেই মনে হল আমিতো মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পাবার মত এত মেধাবী ছাত্র নই। স্বপ্নের ঘুরে ভালভাবে চেয়ে সুন্দর ভবনমালায় সাজানো একটি মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের ভিড়ে নিজেকে একজন ছাত্রই দেখলাম। আকদ সমাপ্ত হলে মনে হল মহান আল্লাহর ইচ্ছায় আমার দেখা সেই স্বপ্নটিই যেন একটু হেরফের হয়ে সত্যে পরিণত হয়েছে, আমি চিকিৎসক না হলেও আমার অর্ধাঙ্গিনী সিলেট সরকারি মেডিকেলের ছাত্রী ছিলেন। তাহলে নিশ্চয়ই এই বিয়ে পরম করুণাময়ের ইচ্ছারই এক শ্বাশত প্রতিফলন ছাড়া আর কিছু নয়। পরবর্তীকালে আমি সিলেটের নর্থইস্ট মেডিকেল কলেজের পরিচালক হবার একটা ইশারাও এই স্বপ্নের অন্য মর্মার্থ হতে পারে।
আমাদের
পক্ষে কোন তাড়া না থাকলেও কনেপক্ষের প্রবল চাপে ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫ রোববার আকদ অনুষ্ঠিত হল। এই বিয়ের কাবিন সাব্যস্ত হয় মাত্র চার লক্ষ এক টাকা। আমার পশ্চিমবাড়ির চাচাত ভাই জহিরউদ্দিন চৌধুরী ওরফে রেজোয়ান ভাই হন এই বিয়ের উকিল। কনের এজিন নিতে আব্বা সফিকুর
রহমান চৌধুরী, তার ভাগনা আমার স্বাক্ষী এডভোকেট মাসিয়াতউল্লাহ চৌধুরীর কারে চলে
যান সিলেট শহরের ৪৬, কাজলশায়, কনের পিত্রালয়ে। কনেপক্ষের স্বাক্ষী হন আমার বড়
সমনদি কবির আহমদ চৌধুরী ও ফুফুতো দুলাভাই হোসেন আহমদ চৌধুরী।
তখন রোববার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। আকদ অনুষ্ঠানের পর আমি এক অবর্ণনীয় ভাবনার সাগরে ডুবসাঁতার দিলাম। আমি একি করলাম, সঠিক করলাম, নাকি অঠিক কিছু করে বসলাম? ভাবনার রাজ্যে তখন বিরাজ করছে এত এত অল্পবয়স্কা অনিন্দ্যসুন্দরী তরুণী কনেদেরে হাতের তালু হতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কিনা বেছে নিলাম আমার কাছাকাছি বয়সের একজন চিকিৎসক যুবতীকে। সুতীব্র রূপের ঝলকানি এড়িয়ে বংশ, শিক্ষা ও সদগুণকে কবুল বলে বুকে জড়িয়ে আমি কি তাহলে নিজেকে সেক্রিফাইস করলাম।
মনে হল মহাসম্মানিত জনক ও মহাগুণান্বিতা
জননীর শুভ ইচ্ছে বাস্তবে রুপায়িত করতে আমি যেন শেষবেলা নির্বাক হয়ে গেলাম। আমার
এত চিন্তিত বিবর্ণ চেহারা দেখে আকদের দুইএক দিন আগে
আম্মা আসমতুন্নেসা বললেন সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে, আজকের মধ্যে হ্যাঁ অথবা না, একটি বলে
দিতে হবে। কিন্তু এত দুশ্চিন্তার পরও আমি না বলতে পারলাম না। জাতীয় সংসদে প্রায়ই
হ্যাঁ জয়যুক্ত হবার মত আমার মনের সংসদে শেষ পর্যন্ত ‘হ্যাঁ’ ই জয়যুক্ত হল।
বিয়ের
শুভদিন নির্ধারণ হল ১৪ মে ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দ রোজ
রবিবার। তখন রবিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। বিগত পাঁচ বৎসর পূবালী ব্যাংক অফিসার পদে চাকুরি করে সামান্য বেতন হতে ফোঁটা ফোঁটা করে কিছু
টাকা ভান্ডারে জমা হয়। বিয়ের খরচের জন্য এটা যথেষ্ট ছিলনা। লন্ডন
হতে বড়ভাই বিয়ের খরচের জন্য পাঠান ষাট হাজার টাকা। সেই সময়ের
জন্য একটা বড় অংকই ছিল। তখন পঞ্চাশ হাজার টাকায় কনের ভাল সোনার সেট ক্রয় করা সম্ভব
হত। অথচ এখন পনের লক্ষ টাকার দিয়েও সোনার সেট কেনা যায়না।
বিয়েবারের
আগের সাপ্তাহ আমি খুব দুশ্চিন্তা ও
অস্থিরতায় অতিবাহিত করি। বড়ভাই তাহমিদ চৌধুরী লন্ডনে ও মামাবাড়ির আত্মীয়রা সবাই
ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ায় ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন অনেকেই বিয়েতে নেই। তাদের
অনুপস্থিতি মনটাকে বেশ ভারাক্রান্ত করে। আমার বড়খালা আবেদা চৌধুরী জবা ও ছোটখালা
মরিয়মুন্নেছা আসেন। খালাত ভাই বুলবুল, তারেক ও সাহেদ আসেন। পাতারিয়া হতে হাসমতি ঝি
তার সমি, ছামিনা ও অকিলকে নিয়ে আসেন। মনে পড়ে আম্মার প্রিয় সুয়াই ঝিও এসেছিলেন।
বাড়ির আঙ্গিনায় গায়ে হলুদের স্টেজ ও প্যান্ডেল তৈরি হয়। বোন রেহা, সেহা, মান্না ছোটভাই নিশাত, ভাগ্নি পপি, পলি, চুন্নি, গিন্নি, লিজা ভাগনা লবিদ, হুদহুদ, রুহুল, মুন্না, হুরসহ বাড়ির চাচাত ভাইবোন, ভাবী, বাড়ির ভাতিজা ভাতিজি আত্মীয় প্রতিবেশী সবাই জমায়েত হন। ফুফুত ভাই বোনরাও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। গ্রামের লোকজন এলে বাদসন্ধ্যা বাড়ি লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে।
নাসরিন ভাবী, মিছবাহ ভাবী, ভাগ্নী পপি, চুন্নী, গীনি ভাতিজি হামিদা, জুবেদা, এমেলি, টুনি গায়েহলুদ পর্ব শেষ করে দুইহাতে
মেহদি লাগিয়ে দেন। আমার তিন দুলাভাই লিয়াকত চৌধুরী,
আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী ও মুফতি মোঃ খালেদ সবকিছু দেখবাল করেন। ছোটভাই নিশাত অনুষ্ঠান
ভিডিও করা, প্যান্ডাল সাজান নিয়ে ব্যস্ত। আম্মা ও আব্বার উপর খুব কাজের চাপ পড়ে। ঘরের বাহিরে আঙ্গিনা ও
বাংলো জুড়ে জুনাকির মত জ্বলানিভা করা অজস্র রঙিন
মরিচবাতির তীব্র আলোকসজ্জা বাড়ির সামনের বড় পুকুরপারে স্থাপিত সুন্দর বিয়ের গেট
“বিয়ে বাড়ি” পর্যন্ত এক অনাবিল আনন্দ ও উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি করে।
আত্মীয়স্বজনদের অনেক গাড়ি ছিল, তাসত্বেও আর পনের ষোলটি কার ও মাইক্রোবাস ভাড়া করা হয়। একটি দামি সুন্দর ঘিকালার টয়োটা কার শহর হতে কাচা ফুলদিয়ে বিয়ের অপুর্ব সাজে সাজিয়ে আনা হয়। বাড়ির ড্রয়িংরূমে বিয়ের পাজামা পাঞ্জাবি ও শেরওয়ানি পরলাম। পাগড়ি সবাই ছুঁয়ে এনে আমার মাথায় তুলে দেন। বরের আঁটানো ধারাল স্পেশাল জুতাজোড়া খুব কষ্ট করে পরলাম।
এবার আব্বা, আম্মা, খালা, ফুফু ও
মুরব্বীদেরকে পা ছুঁয়ে সালাম দিয়ে বের হয়ে বিয়ের সাঁজে সাজান কারে আরোহন করি। বিয়ের কারের সামনের
সিটে বসেন দুলাভাই আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী ও পিছনে আমার সাথে বসেন পপি, চুন্নি ও
বোন আনিসা মান্না। বাড়ির সামনে প্রায় ত্রিশ পয়ত্রিশটি
গাড়ির লম্বা লাইন রচিত হল। বরের কার সামনে রেখে যাত্রা আরম্ভ হয়। তাঁতিপাড়ার
কার্তিক পালের পুরো পরিবার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের লোক। তার বড়দাদা সঞ্জীবদা শক্তিমান কবি ও
দিদি মালতী পাল গায়িকা। কার্তিক পাল ভিডিও রেকর্ডিং কাজে দক্ষশিল্পীর মত কাজ করেন।
তিনি একটি মোটর সাইকেল চড়ে বরযাত্রার গাড়ি মিছিলের আগপিছে ছুটাছুটি করে বিয়ে
রেকর্ডিং করে যান। আমার বড়ভাইয়ের বিয়েও তিনি রেকর্ডিং করেছিলেন।
বিয়ের গাড়ির
মিছিলটি প্রথমে চৌধুরীবাজার পার হয়। দশবার
মিনিট পর যখন গাড়ির সারি মোগলাবাজার ত্রিমুখা পার হচ্ছিল, এমন সময় পিছনে কি এক
হট্টগোল শুরু হয় এবং সবকটি গাড়ি একসাথে থেমে যায়।
একজন বুড়ালোক বুজালিদা হাতে নিয়ে একটি মাইক্রোবাসের গতিরোধ করে দাড়ায়। কুনারচরের
এই বেয়াদবটার ত্রিমুখায় একটি দোকান ছিল। সকালে আমাদের এই ভাড়া করা মাইক্রোবাস নাকি রাস্তায় দড়ি বাঁধা তার গরুকে ধাক্কা
মেরে আসে। এইসব বেতমিজের দল সড়কে গরুছাগল চরিয়ে অজস্র গাড়ি ও মোটর সাইকেল দুর্ঘটনা ঘটায়, যা অনেক
মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের কারণ হয়। দুষ্ট
বুড়োটা সেদিন গণপিটুনি খেত, আব্বা এসে তাকে বাঁচান। বিষয়টি আব্বা ফয়সালা করে দিলে বিশপঁচিশ মিনিট পর আবার সিলেট অভিমুখে আমাদের গাড়ি মিছিলের শুভযাত্রা শুরু হয়।
আমাদের
গন্তব্য সুবিদবাজার পল্লবী কমিউনিটি সেন্টার। গাড়ির লাইন সেন্টারের পার্কিং পূর্ণ
করে ফেলে। পার্কিংস্পেসে স্থান সংকুলান না হওয়ায় কিছু গাড়ি বাহিরের রাস্তায় অবস্থান নেয়। তিনজন
সমনদি ছাড়া আমার তেমন কোন ঘনিষ্ঠ শালা কিংবা শালিকা ছিলনা
যারা জ্বলাতন করবে। প্রথা পালনে কনেপক্ষের জনকয়েক নরনারী, কিশোর কিশোরী লম্বা ফিতা
টেনে বিয়ের গেট ধরেন। নাইম, নাসিম, সুফিয়ান, সেলিম, হালিম, আনিকা ভাবী, লিয়াকত
দুলাভাই, কুদ্দুস দুলাভাই, হোসেন দুলাভাই, মাসিয়ত ভাই, বুলবুল ভাই, তসনু চাচা,
আজিজ ভাই, কেফায়ত ভাই, সেলিম ভাই ও ভাবীরা অনেক ঠেলাধাক্কা, বাকবিতণ্ডা ও রঙ
তামাশা করে, গেটধরার ফিস বাবদ কিছু টাকা আদায় করে সবাই আমার হাতে ফিতা কাটার সিজর
তুলে দেন। ফিতা কাটতেই রনকেলি দিঘিরপারের তসনু চাচা এসে আমাকে ধরে
ধীরে ধীরে বাঁপাশে বরের জন্য নির্ধারিত স্টেজে নিয়ে যান।
কার্তিক বাবু বিয়ে রেকর্ডিংয়ের কাজ যথারীতি করে যান। পল্লবী সেন্টারের পুরুষ ও মহিলা হলরোম অনেক ডাক্তার, ব্যাংকার ও আত্মীয় স্বজনে কানায় কানায় ভরে যায়। তখন ছিল প্রচন্ড গরম, বরাসনে বসেই আমি চিকন কষ্টকর জুতা হতে মুক্ত হই। কিছুক্ষণ পর মনে হল মুখে রুমাল ধরে রাখার কোন দরকার নেই, তাই রুমালটি চুপে চুপে পকেটে পুরে নেই। গাত্রে বিয়ের ড্রেস মোগলযুগের অভিজাত পোষাক শেরওয়ানি ও শিরোপরে সাদা পাগড়িটা কেবল বহাল থাকে। গলে ঝুলে আছে সোনালি জরির মালা।
ঘনিষ্ঠ শালা/শালিকা না থাকায় বরমঞ্চে বসে কোন ধরনের রঙডং কিংবা
খুনটুসির জ্বালায় আমাকে পড়তে হয়নি। কেবল আনিকা ভাবী, জেসমিন ভাবী, নাটেশ্বরের
মোস্তফা ভাবী ও ডাঃ আহমেদুর রেজা রুবি ভাবী এসে দুই চার কথা বলে চলে যান। রেবু আপা, বেবী
বোন, এনি বোন, মনাক্কা আপা, খুশনা বোন,
হুসনা আপা, লুকবা আপা, সালেহা আপা, আনোয়ারা আপাসহ কয়েকজন জ্যাঠালী এসে উঁকিঝুঁকি
মেরে লম্বাফর্সা, চিকন, মায়াবী চেহারার ঘন কালকেশী বরমিয়াকে দেখে বেশ সন্তুষ্টচিত্তে
চলে যান।
প্রথাপালনে
বরের জন্য সযতনে তৈরি করা হয় এক বিশেষ ধরনের খাবারের বিশাল ডিস, যাকে
সিলেটী ভাষায় বলে ‘সদরআনা’। আমার সামনে সদরআনা পরিবেশন করা হল। বড় বড়
ডিস জুড়ে কারুকাজে সাজানো বেশ কয়েকটি আস্ত মোরগের রোস্ট
পোলাওয়ের উপর বসিয়ে দেওয়া হল। ডিসগুলোর চারপাশ জুড়ে চিপস, নারকেল, টমেটো,
গাজর, আলু ও ডিম শৈল্পিকভাবে কেটে দৃষ্টিনন্দন করে সাজিয়ে আনা হয়। বন্ধু সিদ্দিক নির্ঝর,
ভাগনা লবিদ, হুদহুদ, রুহুল, নুরুল, সাহেদ আমার সামনে সদরআনা খেতে ঠেলাঠেলি করে বসেন।
আস্ত মোরগের রোস্টগুলো কেটে ছিড়ে সবার পাতে পড়ে।
ঐ দিনটা যেন দ্রুত পার হয়, কখন যে বিকেল হয়ে যায় ঠাহর করা যায়নি। এবার বরকনে একত্রিত করার ডাক আসে। আমার তিন বোনরা বললেন সন্ধ্যার সাথে সাথে দাউদপুর চলে যেতে হবে। উভয় পক্ষের আত্মীয়রা এসে আমাকে মহিলা হলে কনের মঞ্চে নিয়ে যান। এখানে আমরা বর ও কনেকে ঘিরে আত্মীয়স্বজনের ভিড় জমে। প্রায় তিনমাস আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫ আকদ অনুষ্ঠান হলেও মাত্র দুইচার বার ফোনালাপ ছাড়া আমি কখনও কনের মুখোমুখি হইনি। অবাক করা ব্যাপার হল তিনমাস আগে পত্নীর অধিকার পাওয়া একজন নারীর কাছে আমি এই প্রথম আসি, তার সাথে এটাই আমার প্রথম দেখা সাক্ষাৎ।
কনের পাশে
তখন ছিলেন তার বাল্যবান্ধবী সুনামগঞ্জ সরকারি জেলা হাইস্কুলের
স্বনামধন্য প্রধানশিক্ষক মোহাম্মদ আলী স্যারের কন্যা সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষিকা ফাহমিদা আক্তার দিবা।
প্রথমে বিয়ের লাল শাড়িপরা কনে আমার গলে মালা পরান, পরে
আসে আমার মালা পরানোর পালা। মালাবদলের পালা শেষ হলে আমরা পরস্পরকে মিষ্টিমুখ করাই।
এবার আত্মীয় মুরব্বিদের সালাম করার পালা আসে। সাদা ইস্ত্রিকরা পরিপাঠি প্যান্ট ও
সার্ট পরে আমার শ্বশুর এনাম উদ্দিন চৌধুরী এসে সামনে দাঁড়ান। তাঁর দুচোখ ছিল অশ্রুভেজা।
কারণ তিনি কোনদিন মেয়ে হতে বিচ্ছিন্ন হননি। পা ছুঁয়ে সালাম
করি, তসনু চাচা আমার শ্বশুরের মামাতো ভাই, তাঁর বাড়ি রনকেলী দিঘিরপার, বললেন, পা ছুঁতে হবেনা, মুখে আসসালামু আলাইকুম বললেই চলবে।
শ্বাশুড়ি মলিকা খানম চৌধুরীকে
পাছুঁয়ে সালাম করে দাড়ানোর পর তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, আমার একটিমাত্র
মেয়ে, তাকে আগে আল্লাহ পরে তোমার হাতে সঁপে দিলাম। নিশ্চয়ই তুমি তার যথাযত মুল্য বুঝবে। তখন আমার
মনে হল তার এই মেয়েতো কোন কচি কিশোরী নন বরং একজন পরিপুর্ণ মানবী। তিনি
শহরের একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক, বরং আমিই তাঁর কাছে হয়ত নিজেকে সঁপে দিয়ে এই কঠিন সংসারে প্রাণে বাঁচলাম। দরগামহল্লার সাজেদা খালা, রণকেলি দিঘিরপারের বড়খালা ও গওহরপুর রাউতখাই চৌধুরীবাড়ির খালাকেও তখন সালাম করি। নতুন কনেও
আমার আম্মা, আব্বা, খালা, ফুফু ও মুরব্বিদেরকে জনে জনে সালাম করেন।
নববধু ডাঃ নুরজাহান বেগম চৌধুরী শাহরিন ও আমি সন্ধ্যা নাগাদ পল্লবী সেন্টারের কনেমঞ্চ হতে নেমে ধীরপদে হেঁটে হেঁটে সেন্টারের সামনে এসে বিয়ের সাজানো কারে আরোহন করি। গাড়ি সিলেট শহর ঘুরে শাহজালাল সেতু পার হয়ে দ্রুত ফেন্সুগঞ্জ রোড ধরে এগিয়ে যায়। মাত্র বারচৌদ্দ মিনিটের মধ্যে দাউদপূর পূর্ব চৌধুরীবাড়িতে নির্মিত বিয়ের গেট পার হয়ে বাংলো ঘরের বামদিকে এসে থামে। নববধু উঠানোর জন্য বাড়ির ভাবীরা ও গাঁয়ের মহিলারা এসে ভীড় করেন। আমার বাড়ির ভাবীরা, মাতা ও খালারা সবাই এগিয়ে আসেন। বাড়ি ও গ্রামের বালবাচ্চাদের হট্টগোলের মধ্যে কনে গাড়ি হতে নেমে অতি ধীর পদক্ষেপে অগ্রসর হন। আমাদের টিনের পাকা বড়ঘরের ড্রয়িং রোমে গিয়ে সুসজ্জিত সোফাসেটে লাল ওড়নায় মুখঢেকে লালশাড়ি ও সোনার অলংকারে সুসজ্জিত নববধু নির্বাক হয়ে নীরবে বসে থাকেন। বড় ড্রয়িংরোম ও সামনের বারান্দায় লোকের ভিড় লেগে যায়।
সিলেট শহরের অতি সন্নিকটে এই সবুজ নিরিবিলি অজপাড়াগাঁয়ে শ্বশুড়বাড়িতে শহরের চিকিৎসক ডাঃ নুরজাহান বেগম চৌধুরী ওরফে শাহরিন এই প্রথম তাঁর পদচিহ্ন এঁকে দিলেন। নববধু বললেন, রেঙ্গা দাউদপুর নাম জীবনে অনেক শুনেছি, মনে হত অনেক দুরের কোন এক অচিন গাঁও, সিলেটের যে এত কাছে কখনো ভাবিনি। এই গ্রামের বধু হব জীবনেও কল্পনা করিনি।
এবার হাসমতি
ঝির মেয়ে শমি ও সামিনা একটি শূন্য চিলিমছি ও একটি বদনায় জল নিয়ে আসে। তারা
নববধুকে পা ধুয়ে বধুবরন করে । পদ ধুয়া কালে কে যেন কনের হয়ে একমুঠো আধুলী টংটং শব্দে চিলিমছির জলে নিক্ষেপ করেন।
এটা নাকি পদধুয়ার পারিশ্রমিক। একটু পরে ছোট আপা আনিসা মান্না দুইগ্লাস শরবত ও দুই কাঁপ
মিষ্টি এনে সামনের টেবিলে রাখেন। আমি শরবতে চুমুক দিয়ে কনের ঠুটে ঢেলে দেই। নববধুও
তার গ্লাসে চুমুক দিয়ে আমার ঠোঁট ছুঁয়ান।
অনুরূপ দুজনের মিষ্টিও ভাগাভাগি করে খাওয়া হল। এখানে আবার কাচা ফুলের মালাবদল হল।
খুবদ্রুত বেশ রাত নেমে আসে। আমি নববধুকে নিয়ে পাশের ডাইনিং রোমে গিয়ে খাবার সেরে নেই।
আমাদের
পাকাটিনের লম্বাঘরের মধ্যবর্তী কক্ষটি আমার বোনেরা বাসরকক্ষ রূপে অপূর্ব সাজে
সাজান। একটি বড় সেগুনকাটের পালংজুড়ে
ডাবল পুরু বিছানা পাতা ছিল। এই পালংটি এতবড় ছিল যে এখানে তিনজন লোক অনায়াসে ঘুমানো
যেত। তিনপাশে প্রচুর খালি জায়গা রেখে কক্ষের মাঝখানে পালঙ্কটি
বসানো ছিল। কাচাফুলে সাজানো পালঙ্কে গোলাপ ফুলের পাপড়ি ছিটানো ছিল। তখন ছিল
গ্রীষ্মকাল, সেইসাথে মশার উপদ্রপ। উপরের ছাদে ঝুলানো বৈদ্যুতিক পাখাটি ধীরলয়ে
ঘুরছিল। একটি নাইলনের মিহিসূতার রঙ্গীন মশারি বাসর রাতের পালংটিকে আবৃত করে রেখেছিল। মশারি
আবর্তন করে সাজিয়ে রাখা গোলাপ, রজনীগন্ধা, বেলী, গন্ধরাজের পুস্পমালার সারি হতে সারাটা কক্ষে মধুর সুবাস
বইছিল। এই কক্ষে কয়েকটি চেয়ারযুক্ত একটি টেবিল, একটি ওয়াড্রব ও একটি আয়নাযুক্ত সাজ
টেবিল ছিল। বড় বাথরুমযুক্ত কক্ষটি এত প্রশস্ত যে এখানে যথেষ্ট হাঁটাহাঁটি করার
জায়গাও রয়েছে। রাত দশটায় দুইটি খালি গ্লাস ও এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে কক্ষে ঢুকেন আমার মুরব্বী সুয়াই ঝি।
‘তোমরা বসে বসে গল্প কর’ বলে তিনি বেরিয়ে যান এবং দরজার বাহিরের দিকে খিল লাগিয়ে বন্ধ করে দেন। তিনি বেরুবার পথ বন্ধ করে দিয়ে আমরা দুইজন অজানা অচেনা নর ও নারীকে জেলখানার নির্জন প্রকোষ্টে নিক্ষেপ করে দেন। কি যেন এক অচিন লজ্জার মেঘমালা এসে আমাদের মনের আকাশ একদম ছেঁয়ে ফেলে।
রাত পেরিয়ে ভোরের আজান শুনলাম। কিভাবে সেই চিরস্মরণীয় রাতটি হারিয়ে গেল জানিনা। পরদিন অনেক বেলা করে ঘুম ভাঙল, ডাক্তারনী ঘুম হতে উঠলেন খিকড়ানো এলোমেলো চুল নিয়ে যেন বহু বছরের ধকল সয়ে ফিরে এসেছেন। দুজন উঠে নাস্তা করলাম, কিন্তু ঘুম আমাদেরকে ছাড়তে চায়না। দিনটা পেরুলো এক তন্দ্রাচ্ছন্ন মাদকতার নেশায়।
পরদিন ১৬মে ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দ, মঙ্গলবার, শাহজালাল উপশহরের আধুনালুপ্ত গ্রীন কমিউনিটি সেন্টারের আমাদের ওয়ালিমা অনুষ্ঠান হয়। পাশেই আমার তালুই ইলিমুর রাজা চৌধুরীর বাসা। বিউটি পার্লারে না পাঠিয়ে এই বাসায় কনে সাজাতে বসেন আমার ছোটবোন মান্না। বিউটি পার্লারের পেশাদার কর্মীদের মত নিখুঁত করে কনে সাজানো সম্ভব হয়নি। রঙ ও ম্যাকআপ তেমন যুতসই হয়নি। আমি কনেপক্ষের দেওয়া উপহার স্যুট কোট টাই জুতা পরে একটি কালো সানগ্লাস চোখে দিয়ে এগারটা নাগাদ গ্রীন কমিউনিটি সেন্টারে আসি। কিছুলোককে কানের কাছে বলতে শুনলাম দুলামিয়াকে দারুন স্মার্ট মনে হচ্ছে, যেন একদম অভিনেতা সালমান খান। আমি কিনা সালমান খান? কই আসমানের চাঁন্দ আর কই মাটির পিদিম, তারপরও ভুয়া প্রশংসা শুনে আমি কিছুটা ব্যংফোলা ফোলে গেলাম।
উপশহরের কমিশনার সফিক ভাই, ফাজিলপুরের ফজলু দোলাভাই, কানিহাটির জদিদ ভাই ও তালুই ইলিমুর রাজা চৌধুরী সব কাজে কাছে থেকে সহায়তা করেন। অত্যাধিক কর্মব্যস্ত অফিসের কাজ সামাল দিয়ে বিকেল বেলায় পূবালী ব্যাংক লিমিটেড, কদমতলী শাখার ব্যবস্থাপক মিনহাজ স্যার আমার সব সহকর্মীদেরকে নিয়ে অনেক দেরীতে এসে উপস্থিত হন। তখন তিনচার ব্যাচের খাবার সমাধা হয়ে গেছে, তাই পড়ন্ত বেলায় এসে তাদের ঠান্ডা খাবার খেতে হয়। অবশ্য পরে আরেকদিন আমি একটি হোটেলে তাদেরকে আলাদা করে পার্টি দেই।
গ্রীন
কমিউনিটি সেন্টার হতে বেরিয়ে কনেপক্ষের একটি মাইক্রোবাসে সিলেট শহরে শ্বশুরের বাসা
৪৬, কাজলশায় চলে যাই। বাসার মাত্র দুইজন বাসিন্দা আমার শ্বশুর এনাম উদ্দিন চৌধুরী
ও শ্বাশুড়ি মলিকা খাতুন। কনের খালাতো মোস্তফা ভাবী রান্নাবান্নাসহ সবকাজে আমার
বৃদ্ধা শ্বাশুড়িকে সহায়তা করে যান। আমার পত্নীকে শৈশবে লালন পালনে সহায়তাকারী
ছলফুরমা ঝি তার মেয়ে ছলফুকে নিয়ে এই বাসায় অবস্থান করেন।
যে দুইতিন দিন এই বাসায় অবস্থান করি তখন কনেপক্ষের আত্মীয় ফুফুত সেলিম ভাই ও ডাঃ আহমেদুর রেজা ভাই, খালাত কেফায়ত ভাই, তসনু চাচা, কবির ভাই ও জেসমিন ভাবী আসেন। আজিজ ভাই ও
আনিকা ভাবী রাতে একটি হোটেলে অবস্থান করে দিনে এখানে সময় কাটান।
দাউদপুর ফিরে আসার পর সাতদিনের ছুটি গাঁয়ের সবুজ শ্যামল বাড়িতে মা, বাবা, ভাই বোন, ভাগনা ভাগ্নী ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন পরিবেষ্টিত হয়ে আনন্দ উচ্ছাসের মধ্যে পার হয়। আমাদের বেশিদিন অলস বসে কাটানোর সুযোগ নেই। আমি ছুটলাম আমার কর্মক্ষেত্র সিলেট শহরের পুবালী ব্যাংক লিমিটেড, কদমতলী শাখায় এবং ডাঃ নুরজাহান চৌধুরী শহরে ফিরে এসে তার গাইনি রোগী নিয়ে আবার ব্যস্ততার সাগরে সাঁতার দেন। একদিন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ ফরহাত মহল নব বরবধুকে চাইনিজে দাওয়াত করেন। ফরহাত মহল আপার স্বামী তারেক দুলাভাই, তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে, ডাঃ মাহবুব রশিদ, ডাঃ হাবিবউল্লাহ খান ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ শামিমা আক্তার এফসিপিএস এই চাইনিজ পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন। ডাঃ হাবিবউল্লাহ খান বিসিএস পাস করে সিলেট মেডিকেল কলেজে সরকারি চাকুরীতে যোগ দেন, এমডি পাস করে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হন। দুঃখের বিষয় তিনি অল্প বয়সে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে সিলেট মেডিকেলে মারা যান। ডাঃ মাহবুব রশিদ ডিডিভি চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ, তিনি নর্থইস্ট মেডিকেল কলেজের চর্মরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। মাহবুব রশিদ কিডনি ডায়লাইসিস করে দীর্ঘদিন বেঁচে থেকে অবশেষে নর্থইস্ট মেডিকেল কলেজে ২০২৫ সালে অকালে ইন্তেকাল করেন। তিনি পত্নী ও একমাত্র পুত্র রেখে যান। সিলেট মেডিকেল হতে আসা এই দুইজন জুনিয়র চিকিৎসক ডাঃ নুরজাহান বেগমের সহকর্মী ছিলেন, তাঁরা তাঁকে আপা, আপা বলে ডাকত। তাঁরা ছিল মেধাবী, পরিশ্রমী ও বিনয়ী। কিন্তু নিয়তি তাদেরে তেমন সময় দেয়নি।
তারপর নব বরবধূকে দাওয়াত খাওয়ানোর ধুম লেগে যায়। দাওয়াত খেতে ছুটলাম রেবু আপা, লুকবা আপা, হুসনা আপা, ডাঃ আহমেদুর রেজা ভাই, সাজেদা খালা প্রমুখের বাসায়। আমার শ্বাশুড়ির চাচাত বোন সাজেদা খালার দরগার বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়ে আমার আব্বা সফিকুর রহমান চৌধুরী পেয়ে যান তার পুরানো দিনের ১৯৩৭-১৯৪১ সালের এমসি কলেজের সহপাঠী ঢাকাদক্ষিণ কানিশাইল গ্রামের আব্দুর রহমান চৌধুরীকে, যিনি সাজেদা খালার জীবনসাথী। বহুবছর পর বৃদ্ধ বয়সে দুইবন্ধু আবার অতীতের স্মৃতিচারণে নিমগ্ন হন।
নাটেশ্বর গ্রামে খালাত মোস্তফা ভাইয়ের বাড়িতে যাবার আমন্ত্রণ পেলাম। এবারও গেলাম সপরিবারে আমার জনক ও জননীকে নিয়ে। সাচান গ্রাম পেরিয়ে দুইমাইল পূর্বদিকের এই জনপদেরও একপাশে সিলেট জকিগঞ্জ সড়ক ও অন্যপাশে সুরমা নদী বয়ে যাচ্ছে। বিকেলে সুরমা নদীতে নৌভ্রমণে বের হলাম। খোলা নৌকাটি নদীর পার ঘেঁষে চালিয়ে দেড়দুই মাইল দূরের গাছবাড়ি বাজারে নিয়ে গেল। জীবনে এই প্রথম ঘরের পাশের জনপদ কানাইঘাটের মাটিতে পা রাখলাম। গাছবাড়ি বাজারঘাটে পা রেখে মনে হল আমি যেন এক প্রত্যন্ত টুপি ও বোরকার দেশে নামলাম। নদীর এপারে মহিলাদের পরনে সবুজ শাড়ি এবং ওপারে কেবল কালো বোরকার ছড়াছড়ি। ছোট ছোট বালিকাসহ জোয়ানবুড়ো সবনারীই এখানে আপাদমস্তক কালো বোরকার ভিতর লুকিয়ে হাঁটাহাঁটি দৌঁড়াদৌঁড়ি করছেন। বাজারে অবস্থিত গাছবাড়ি মাদ্রাসা মসজিদে আমরা আসরের নামাজ আদায় করে নৌপথে ফিরে আসি। মোস্তফা ও মর্তোজা ভাইয়ের বাবা ছিলেন এই গ্রামের এককালের সম্পদশালী লোক কিন্তু এখন তাদের সেই রমরমা অবস্থা নেই।
আমার বিয়ের
পর সবচেয়ে আন্তরিক ও ঘনিষ্ঠ একজন আত্মীয় লাভ করি। তিনি আমার
শ্বশুরের আপন মামাতো ভাই রনকেলি দিঘিপারের তসনু চাচা। অতি হাসিখুশি তসনুচাচার মেয়ে রুমা তখন সিলেট
ওসমানি মেডিকেল কলেজের ছাত্রী। মেয়েকে
পড়াতে গিয়ে সপরিবারে কাজলশাহ এলাকায় বাসাভাড়া করে একই পাড়ায় বসবাস করতেন। রুমা
মেধাবী ছাত্রী, সে ময়মনসিংহ মহিলা ক্যাডেট কলেজ হতে এস এস সি এবং এইচ এস সি পাশ
করে সিলেট মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। খেলাধুলায় স্কলার রুমার কক্ষজুড়ে সাজানো আছে
ক্যাডেট কলেজ জীবনে অর্জন করা অগুণতি ক্রেষ্ট ও মেডেল।
১৯৮৩ সালে
এমসি কলেজ মাঠপারের রাস্তায় সিরিয়া আপার কারের স্টিয়ারিং ধরে খানিকটা গাড়ি চালানো
চেষ্টা করলেও ড্রাইভার হতে পারিনি। ড্রাইভার হতে হলে দীর্ঘদিন গাড়ি চালানোর
প্রয়োজন হয়। তসনু চাচা আমাকে নুতন করে গাড়ি চালানো শেখান। আমাদের সাদা টয়োটা কারটি
চালাত আমার ছোটভাই নিশাত। এই কারটি
দাউদপুরের বাড়ি হতে কাজলশাহ নিয়ে আসি। আমার শ্বশুরের মামাত ভাই তসনু চাচা আমাকে গাড়িচালনা শিখাতে নিয়ে যান সিলেট মেডিকেল
কলেজের মাঠে। গাড়ি চালানোর খানিক পুর্ব
অভিজ্ঞতা থাকায় অল্প কয়েকদিনেই গাড়ি চালান রপ্ত করে ফেলি। গাড়ি চালানো প্রথম দিকে
পাহাড়সম কঠিন মনে হলেও কিছুদিনের মধ্যে জলবৎ তরলং হয়ে যায়। তবে অভিজ্ঞ না হওয়া পর্যন্ত এই জলবৎ তরলং অবস্থায়ই বেশি বেশি দুর্ঘটনা ঘটে যায়।
এবার তসনু
চাচা আমাকে তার গ্রামের রনকেলী দিঘিরপারের
বাড়িতে নিয়ে যেতে অধীর হয়ে উঠেন। শ্বশুরেরও সেবাড়িতে যাবার খুব আগ্রহ, কারণ
তিনি এই নানাবাড়িতে অবস্থান করে বাল্যকালে গোলাপগঞ্জ এম সি
একাডেমিতে লেখাপড়া করেন। তাই মামাত ভাইদের সাথে তার সম্পর্ক অনেকটা আপন ভাইয়ের মত সুদৃঢ়। একদিন সুযোগ তৈরি হলো,
সেদিন আমার শ্বশুরের মামাত ভাই মেজর জেনারেল শফি আহমদ চৌধুরী রনকেলী আসেন। ১৯৮০ সালে এরশাদের ক্ষমতা দখলকালে
তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিডিয়ার প্রধান। এই সময় তার অন্য
ভাইদের মধ্যে তজন চাচা ছিলেন জয়েন সেক্রেটারি,
টিয়া চাচা মেজর, মনুচাচা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর উপপ্রধান, রসুচাচা পুলিশের এস পি
এবং ফজন চাচা ব্যবসায়ী। এখন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল শফি চাচা প্রায়ই ঢাকা হতে রনকেলী
আসতেন। তার ছিল বরশী দিয়ে মাছ ধরার তীব্রনেশা।
অপুর্ব সুন্দর তিনস্থরের টিলাবাড়ির সামনে চার একর জায়গা জুড়ে
রনকেলী দিঘি, তিনি একটি চেয়ারে বসে একমনে এই দিঘির
জলে বরশী ফেলে মাছধরে সময় কাটাতেন ও দিঘিপারের
মসজিদে নামাজ পড়তেন।
কোন এক
ছুটির দিনে শ্বশুর শ্বাশুড়ি ও তসনু চাচাকে
নিয়ে আমার সাদা কার ড্রাইভ করে আমরা শ্বশুরের নানাবাড়ি রনকেলী দিঘিরপারে
যাই। খাবারের আয়োজন হল পুলিশ সুপার রসুচাচার পুত্র উজ্জল চৌধুরীর বাগানঘেরা সুন্দর বাংলোয়। এই
চাচারা আমাকে এতই স্নেহ ও সম্মান করলেন যে মনে হল আমি তাদের আপন ভাগনিপতি। আমার
জীবনে এমন ঘটনা দেখেছি যেখানে আমার সম্মান পাবার কথা সেখানে পাইনি, আবার যেখানে
সম্মানের তেমন আশা করিনি, সেখানে সবার কাছে প্রচুর সম্মান
পেয়ে মূল্যায়িত হয়েছি। এই মহান চাচারা আজ আর কেউ বেঁচে নেই। রনকেলিতে তাঁদের সবার জানাজা হয় উত্তর-রকেলির টিলাময় ঈদগায়। এই ঈদগাহের পাশের টিলায় তাঁদের পারিবারিক গুরুস্থানে সবাইকে দাফন করা হয়। তাঁদের প্রতিটি জানাজায় যাবার সৌভাগ্য আমার হয়। মহান আল্লাহ পাক তাদেরকে দুনিয়ার মত আখেরাতেও উচ্চাসন দান করুন, আমিন।
এই রনকেলী দিঘিপারের অন্যটিলায় আমার বড় খালা শ্বাশুড়ির বাড়ি। একমাত্র খালাত ভাই সুফন চৌধুরী লন্ডনে অবস্থান করেন। তিনি দেশে এলে খালাত বোন সেবু আপা ও বেবি বোন আমাদেরকে দাওয়াত দেন। রনকেলী দিঘিপারের বাড়িতে বড় গরু জবাই করে শিরনি করা হয়। রনকেলি বড় খালা শ্বাশুড়ি আমাদেরকে তার বারমাসি কাটাল গাছের পাকা কাটাল ও রান্নার সবজি কাঁচা কাটাল (ঘাটি) খালাকে দেখতে গেলেই সর্বদা আমাদের গাড়ির বেনেটে তুলে দিতেন, যদিও তখন কাটালের মৌসুম ছিলনা। সেবু আপা ঢাকায় থাকতেন, তিনি সিলেটে এলেই আমাদের বাসায় আসতেন। আমরা সবার জন্য তাঁর হৃদয়ের টান ছিল সীমাহীন। তিনি একবার আমাদের বাসা হতে ঢাকা ফেরার কিছুদিনের মধ্যে হার্টএটাক হয়ে চিরতরে হারিয়ে যান। আমিন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন