শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

আমার প্রথমবার দেখা শ্বশুরবাড়ি, চারখাইয়ের সাচান গ্রামঃ

 

আমার প্রথমবার দেখা শ্বশুরবাড়ি, চারখাইয়ের সাচান গ্রামঃ

এই প্রথম আমার পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে পা রাখলাম শ্বশুরের জন্মগ্রাম চারখাইয়ের সাচান। চারখাই হতে জকিগঞ্জ রোডে দেড়দুই মাইল পেরুলেই রাস্তার বামদিকে সাচান গ্রামের নামফলকযুক্ত বিশাল ফটক। ফটকের দুইদিকে বসার ঢালাই কেদারা। জলবেষ্টিত শান্ত অঁজপাড়াগাঁ সাচান, সামনে সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের ওপারে মৎস্যরাজ্য চুনিয়া বিল পিছনে বহমান সুরমা নদী। বক ও পরিযায়ী পাখিদের আশ্রম। সুরমার ঢালু জুড়ে রবিশস্যের ছড়াছড়ি। বর্ষায় নদীভরা ঘোলা জল, শীতবসন্তে তলদেশে চরের বালিচুষা পরিস্কার পানি করে টলমল। 

আমার শ্বশুরের দুইটি বাড়ি, সাচান গ্রামের প্রবেশ পথের প্রথম বড়বাড়িতে একটি পানা পুকুরসহ সেই বাড়িতে আশপাশের আটার বিঘা জমি সন্নিবেশিত আছে কয়েক পুরুষের পৈত্রিক ভিটেমাটি ভিতরের দুসরা বড় পুকুরওয়ালা বাড়িটিতে তাঁর কয়েক ঘর গোষ্ঠী সম্পর্কীয় আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। পাশের দক্ষিবাড়িতে আমার ফুফু শ্বাশুড়ির বিয়ে হয়। তার একমাত্র ছেলে ডাঃ আহমেদুর রাজা চৌধুরী সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় সিবিল সার্জন ছিলেন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডিপোটি ডায়রেক্টার পদ হতে অবসর গ্রহ করেন।

সাচান গ্রামটি ছোট এবং মাত্র ত্রিশচল্লিশ ঘর লোকের আবাস। কয়েকঘর চৌধুরী ও বাকী হতদরিদ্র লোকজন এখানে শান্তিতে বসবাস করেন। গ্রামে এক ফসলি জমিই বেশী ও জলাভুমিতে প্রচুর মাছ হয়। তাঁর মাছের জলাভুমি দেখাশুনা করতেন আব্দুস সাত্তার, চুনিয়া বিলের মাছ খুব সুস্বাধু। আব্দুস সাত্তার প্রায়ই চুনিয়া বিলের বড় বড় মাস নিয়ে আমাদের সিলেটের বাসায় আসতেন। ভারত হতে আসা কয়েকঘর লোক এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছেন। বর্তমানে পাকা সড়কসহ গ্রামটিতে গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন রয়েছে। 

বর্ষায় গ্রামটি মনে হয় দ্বীপের মত জলে ভেসে আছে। হাঁস সাঁতার কাটে, গাংচিল কেঁদে কেঁদে উড়ে বেড়ায়। নৌকায় বসে চারখাই পর্যন্ত ঘুরে আসা যায়। অগ্রাহায়ণ মাসে সোনালি ধানে সাচানের মাঠ হলুদ হয়ে যায়। সাচান গ্রামকে আমার মনে হয় ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়।

দুপুরের খাবার খেয়ে বাড়ির পিছনদিকে বের হয়ে একটু এগিয়ে সুরমা নদীর তীরে হাঁটাহাঁটি করি। বাড়ির পিছনের এই সুরমা নদীপথে আমার শ্বশুর নৌকা চড়ে বাল্যকালে তার নানাবাড়ী রনকেলী দিঘিরপার ও সিলেট শহরে যাবার গল্প বলতেন। আর বলতেন সার্ট প্যান্ট বুটজুতা পরে গাছবাড়ি বাজার গমনের কাহিনি। আমার শ্বশুর এনামউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন বিপুলবপুর শ্যামলা সুদর্শন লোক, ইস্ত্রি করা পরিস্কার পোষাক পরতেন। গাছবাড়ি বাজারের সুরমাঘাটে একবার তিনি নৌকা হতে নামামাত্র লোকজন তাকে পুলিশ অফিসার মনে করে ভীড় জমায় এবং বাজারের অবৈধ ভারতীয় পাতার বিড়ি ও কমলা লুকানোর জন্য তাড়াহুড়া শুরু করে।

এখানে সুরমানদীর উত্তরপারকে এপারের লোকজন বলেন জৈন্তা, যদিও এলাকাটি কানাইঘাট উপজেলা। সেই প্রাচীনকালে সুরমার ওপার জৈন্তা রাজ্যের অংশ ছিল, তাই এপারের মানুষের কাছে কানাইঘাট আজও জৈন্তাই রয়ে গেছে। কানাইঘাটের লোকজন তাঁদের কাছে আজও জৈন্তাপুরী নামেই পরিচিত। একবার একটি অজানা নৌকা ভাড়া করে আমার শ্বশুর সিলেট শহর হতে প্রচুর ভারী মালামাল ও খাট পালং পাঠান, অনেক অপেক্ষা করলেন কিন্তু বাড়ির পিছনের সুরমাঘাটে নৌকাটি আর কোনদিন এসে নোঙর করলনা।

সাচান গ্রামে সগৌরবে শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি সুন্দর মসজিদ ও দুতলা পাঠশালা। তাঁদের পারিবারিক কবরগাহ সুরমা নদীর তীরে গদারবাজারে সুউচ্চ মালভূমি। এখানেই হজরত শাজালালের(রঃ) সহচর আদিনা সুফির(রঃ) মাজার রয়েছে। হেঁটে পাঁচসাত মিনিট এগুলেই এই অঞ্চলের রাজধানী চারখাই, চার উপজেলা কানাই, জকি, বিয়ানি ও বড়লেখার মিলনস্থল চারখাই। আমার ফুফুতো বোন আসমা আপার সাচানে এবং আব্বার এক চাচাতো বোনের দুহালে বিয়ে হলেও এই এলাকা সম্পর্কে আমার তেমন কোন জানাশুনা ছিলনা। এবার এসে চেখে দেখলাম, ফুফুশ্বাশুড়ির গ্রাম সুরমাপারের ঘোলাঘাট, খালাশ্বশুড়ির গ্রাম নাটেশ্বর, ফুফুর বাড়ি দুহাল, সাচানচক, দত্তেরগ্রাম, আর কত বিচিত্র লোকালয়।   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন