শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

সিলেট শাখায় হানা দেওয়া কিছু বাটপারের কাহিনি

 

সিলেট শাখায় হানা দেওয়া কিছু বাটপারের কাহিনী

যেখানেই টাকার খেলা সেখানেই ওৎপেতে বসে থাকে চোর ডাকাত ও বাটপারের দল। কোন এক ঈদের ছূটির আগে শাখা ছিল খুব ব্যস্ত। টাকা উত্তোলনের জন্য লাইনে কাস্টমাদের ভীষণ ঠেলাঠেলি। আমি কিছুদিন আগে কুদরতঊল্লা মার্কেটের আমার বন্ধু শাহিন লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী শাহিন ভাইকে দিয়ে একটি চলতি হিসাব করাই। তিনি প্রতিদিন লেনদেন করেন। সেদিন আমার ডান টেবিলে মিনহাজুল ইসলাম স্যারের সামনে চেয়ারে বসে পাশে চৌদ্দ হাজার টাকা রেখে জমার ভাউচার লিখছেন। লেখা শেষ করে দেখেন এই চৌদ্দ হাজার টাকা উদাও। আমরা অনেক খোঁজেও এই টাকার কোন সন্ধান পাইনি। শাখায় সেদিন এত ভিড় ছিল যে কাস্টমারের সারি বাহিরের রাস্তা পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। 

ব্যবসায়ী শাহিন আহমদ ভাইকে আমি অন্যব্যাংক হতে ডেকে এনে হিসাবটি খোলাই, তাই নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হলো। পরদিন শাহিন ভাই এসে আমার কানে কানে তাঁর সন্দেহের তীর এই টেবিলে বসা বড়স্যারের দিকে নিক্ষেপ করলেন। আমি জিহ্বায় কামড় মেরে বললাম এইসব কি বলছেন শাহিন ভাই, এই মিনহাজ স্যার পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে নামাজি এবং মানুষ তাকে বিশ্বাস করে লাখ লাখ টাকা সবসময় তার টেবিলে ফেলে রেখে চলে যায়। তিনি আজীবন ব্যাংকে কাজ করেছেন কিন্তু বিন্দুমাত্র কোন বদনাম নেই। 

কিছুদিন আগে ইসলামী ব্যাংক তালতলা শাখায় অনুরূপ একটি ঘটনা ঘটে। একদল সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র সিলেট শহরের বিভিন্ন ব্যাংকে ঈদের ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে এমন অপকর্ম করে যাচ্ছে বলে আমার মনে হল। আমি শাহিন ভাইয়ের টাকা খুয়ানোর বিষয়টি ব্যবস্থাপক আব্দুল মান্নান স্যারকে জানিয়ে দেই যাতে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। কিন্তু মনে হল স্যার বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে খুব হালকাভাবে নিলেন।

এই ঘটনার পর দুই তিন দিন যেতে না যেতেই আর বড় একটি দুর্ঘটনা সিলেট শাখায় সংঘটিত হল। আমার সামনে ক্যাশ কাউন্টারে আমি একজন ব্যবসায়ী যুবদল নেতাকে টাকা উঠাতে দেখি। তিনি ক্যাশিয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছেন এসময় অজ্ঞাত ঠগের দল নিচে কিছু লোজ টাকার নোট ছিটিয়ে বলে আপনার পকেট হতে টাকা পড়ে গেছে। তিনি মোবাইলে কথা বলে বলে টাকা কুড়াতে লেগে যান। তিনি টাকা কুড়ানো শেষ করে উঠে দাড়ালে ক্যাশিয়ার মনমোহন বাবু পঞ্চাশ হাজার টাকা তাঁকে এগিয়ে দিলে ভদ্রলোক আড়াইলক্ষ টাকার চেকের আর দুইলক্ষ টাকা দাবি করেন মনমোহন বাবু বললেন আমি এই একটু আগেই দুইলক্ষ টাকা পরিশোধ করে ফেলেছি। এই নিয়ে বাকবিতন্ডা শুরু হলে ব্যবস্থাপক আব্দুল মান্নান স্যার চেম্বার হতে বেরিয়ে এসে ব্যাংক সাময়িক বন্ধ করে পুরো ক্যাশ কাউন্টার তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান করেন কিন্তু এই দুইলক্ষ টাকার কোন হদিস মেলেনি এদিকে এই যুবদল নেতা টাকা না নিয়ে ব্যাংক ছাড়তে আদৌ রাজি নন। তিনি ফোন করে তার বেশ কিছু লোকজন ও দলের ক্যাডার জমা করে ফেলেন। এজিএম আব্দুল মান্নান স্যারসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেই এই তারিখে অফিসে সারাটা রাত কাটাতে বাধ্য হন। আব্দুল মান্নান স্যার এমন ফাঁদে পড়লেন যে, নিতান্ত বাধ্য হয়ে এই দুইলক্ষ টাকা ব্যাংকের কাঁধে প্রকারান্তে মনমোহন বাবুর ঘাড়ে চাপালেন। সিলেটি ভাষায়, চোর যায় চোরা পথে, সাচ্চা মরে বেরাপথে। 

শেষমেষ মনমোহন দাস এক লক্ষ টাকা জরিমানা দেন ও তার সিলেট শাখার সহকর্মীরা চাঁদা তুলে তাকে বাকি একলক্ষ টাকা প্রদানে সহায়তা করেনআমিও পাঁচ হাজার টাকা তাকে অনুদান প্রদান করি। মনমোহন বাবু সুনামগঞ্জের ভাটি এলাকা তাহিরপুরের লোক। তিনি হাইস্কুলের শিক্ষকতা ফেলে পূবালী ব্যাংকের ক্যাশিয়ার হন। সুচতুর এই লোকটি এককালে ছিলেন কর্মচারী ইউনিয়নের নেতা। সিলেট শাখায় বড়বড় ঋণগ্রহীতা ধনী ব্যবসায়ীদের অভাব নেই। তিনি তাঁদের কাছে ধর্না দিয়ে নিজের এই ভাগ্য বিপর্যয়ের করুণকাহিনী ইনিয়ে বিনিয়ে উপস্থাপন করে করে প্রচুর সহানুভূতি অনুদান আদায় করে নেন। 

পরবর্তীকালে মনমোহন দাস একদিন আমার কাছে স্বীকার করেন যে এই ঘটনায় তাকে কোন ভর্তুকি তো দিতেই হয়নি বরং আর ত্রিশ চল্লিশ হাজার টাকা অনুদান বাবদ তার পকেটে লাভ আসে। সিলেট শাখায় সেদিন শাপে বর হয় তাঁর। এই গল্পটি তিনি যখন বলেন, তখন আমি বরইকান্দি শাখার ব্যবস্থাপক ও মনমোহন দাস সেই শাখার ক্যাশ ইন চার্জ। মনমোহন দাস এখন পরজগতের বাসিন্দা। তিনি শান্তিতে থাকুন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন