পুবালী ব্যাংক লিঃ সিলেট শাখা, বন্দর বাজার, সিলেট, প্রথম মেয়াদ
অবস্থানঃ ১৯ মার্চ ১৯৯৩ হতে ৮ জুলাই ১৯৯৪ সাল, কর্মকালঃ ১ বৎসর ৩ মাস ১৯ দিন
একদিন পুবালী ব্যাংক লিমিটেড সিলেটের অঞ্চলপ্রধান আব্দুল মজিদ স্যার আমাকে তার কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেন আমি কোথায় থাকি। দাউদপুর গ্রামে থাকি জানালে তিনি বললেন আমি আপনাকে একটু এদিকে নিয়ে আসব। আব্দুল মজিদ স্যার খাঁটি শহুরে লোক, তার বাসা ছিল সুবিদবাজার। সবাই বলত স্যার নাকি খুব গরম কিন্তু আমি মজিদ স্যারের কাছে কেবল কোমলতা এবং স্নেহমমতা পেয়েছি, কোন রাগ দেখিনি। আব্দুল মজিদ স্যার তার তিন সন্থানের বিয়েতেই এই অধম সামান্য অফিসার ইসফাক কুরেশিকে চিটি দিয়ে আলাদাভাবে দাওয়াত করেন।
অল্প
কিছুদিনের মধ্যেই আমার হাতে সিলেট শাখায় তাৎক্ষণিক
বদলির আদেশ আসে। মনে মনে খুশি হলাম এই ভেবে, যাক পথের দুরত্ব এখন প্রায় এক কিলোমিটার কমে গেল।
সিলেটের বন্দরবাজারে ব্যাংকের নিজস্ব মালিকানাধীন পাঁচতলা
ভবনের নিচের আড়াইতলা সিলেট শাখা ও উপরের দুইতলা জুড়ে ছিল সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার
আঞ্চলিক অফিস। আমি সিলেট শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক ইলিয়াস উদ্দিন আহমদের কাছে আমার যোগদান
পত্র পেশ করি।
ইলিয়াস স্যারের
বাড়ি কুলাউড়ার লংলা পরগনার বিজলি নামক গ্রামে। প্রথম দিনই আলাপে মনে হল ইলিয়াস স্যার মজার
লোক, বেশ রসে রঙ্গে কথা কন। ওজনহীন হালকা খাটো শরীরটা যেন ফুদিলে বাতাসে উড়ে যাবে।
তিনি তার চেম্বারে বসেন কম, সারাদিন অফিসারদের টেবিলে টেবিলে ঘুরে বেড়ান ও মজার
মজার কথামালার ফুলঝুরি বর্ষণ করেন। তার
বেশিরভাগ গল্পই বানানো হলেও মনে হত সত্য, গল্পের ধরনটা ছিল এরকম- ‘ঘোড়ায় চড়িয়া
মর্দ হাঁটিয়া চলিল, ছয় মাসের পথ মর্দ ছয়দিনে গেল। কিংবা লাখে লাখে সৈন্য মরে কাতারে কাতার, গণনায় ধরা পড়ে দুইচার হাজার’। তিনি
পঞ্চাশোর্ধ একজন হাসিখুশি মানুষ। লোকের পিঠ চাপড়ে তিনি কাজ আদায় করে নিতেন। ইলিয়াস স্যারের
সান্নিধ্যে সিলেট শাখায় প্রথম মেয়াদের দিনগুলো বেশ আনন্দে পার হয়। ইলিয়াস উদ্দিন স্যার মেহদিবাগে সুন্দর একটি বাসা নির্মাণ করেন। একদিন আমরা তাঁর নতুন বাড়ি উদ্বোধনের ডিনার পার্টিতে যোগদান করি।
সিলেট শাখা সিলেট আঞ্চলিক অফিসের বেতন, কয়েকটি গাড়ির খরচ, ক্লিয়ারিং ও ক্যাশ রিমিটেন্সসহ বাহিরের নানা মাত্রাতিরিক্ত খরচ বহন করে, তাই এই শাখায় কখনও লাভ হতনা। সব সময় শাখাটি লস করলেও এই লস কমিয়ে একটা লক্ষমাত্রা হেডঅফিস নির্ধারণ করে দিত। তখন কম্পিউটার ছিলনা, তাই হাতেকলমে সুদ হিসাব করা হত। ৩১শে ডিসেম্বর শাখার বাৎসরিক হিসাব সমাপনীর পর দেখা গেল সামান্য টাকার জন্য লাভ/ক্ষতির লক্ষমাত্রা অর্জিত হচ্ছেনা। ইলিয়াস স্যার বিভিন্ন লেজারের হাতে করা সুদ হিসাবের খাতা তাঁর টেবিলে চেয়ে নিয়ে অনেকগুলো সঞ্চয়ী হিসাব হতে একটু একটু সুদ কমিয়ে দিয়ে লক্ষমাত্রায় পৌঁছে যান।
আমি সামনের চেয়ারে
বসে প্রশ্ন করলাম, স্যার এভাবে সুদ গ্রাহককে কমিয়ে
দেওয়া কি ঠিক হচ্ছে? স্যার বললেন, কুরেশী সাহেব সুদতো সুদ, এমনিতেই হারাম, হারাম জিনিস কম
দিলে পাপ নেই বরং আল্লাহ খুশি হবেন।
আমি আবার
বললাম, আল্লাহ পাক খুশী হবেন ঠিক কিন্তু গ্রাহক যদি বুঝে ফেলে তাহলে কি করবেন? তিনি উত্তর দেন, বলবো সুদ হিসাব করতে
আমাদের একটু ভূল হয়ে গেছে, সরি, আমরা এখনই আপনার সব সুদ
দিয়ে দিচ্ছি, বলে সাথে সাথে পরিশোধ করে দেব।
কিন্তু আমি পরে কোন গ্রাহককেই সুদ কম পাবার অভিযোগ নিয়ে আসতে দেখিনি। আসলে কোন গ্রাহকই তা ঠাহর করতে পারেনি।
ইলিয়াস উদ্দিন স্যারের একটা দোষ ছিল, তিনি চেইন স্নোকার, একটার পর একটা সিগারেট টানতেন। মাঝে মাঝে চোখদুটি দেখা যেত রক্তলাল। কেউ কেউ বলত, তাঁর নাকি সুরাপানের বাতিক আছে।
কিছুকাল পর তিনি সিলেট অঞ্চলপ্রধান নিযুক্ত হন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই দায়িত্বে থাকাকালে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আকর্ষিক মৃত্যুবরণ করেন। ওসিয়ত অনুসারে ইলিয়াস উদ্দিন স্যারকে জন্মভূমি লংলার বিজলি গ্রামে তার পিতার কবরের পাশে দাফন করা হয়।
দশবার জন
কর্মীর মহিলা কলেজ শাখা ছিল একটি ছোট পুকুর, সেখান থেকে সিলেট শাখায় এসে মনে হল আমি একটি দিঘিতে পড়েছি। নতুন অফিসারদের সবধরনের কাজ
শেখার জন্য ছোট্ট মহিলা কলেজ শাখাই বেশী উপযোগী, কারণ
ওখানে টেবিল বদল করে করে সব ধরনের কাজ ইচ্ছেমত শেখার ও করার সুযোগ রয়েছে। প্রায় অর্ধশতাধিক কর্মীর সিলেট
শাখায় সেই সুযোগ সীমিত, এখানে যেজন যে টেবিলে কাজ করে, সে সেই টেবিলের কাজ সারাদিন করেও
শেষ করতে পারেনা, তাই অন্যদিকে তাকানোর ফুরসৎ কারো নেই। এখানে
টেবিল বদল করে নব নব কাজ শেখার সুযোগ তেমনটি নেই।
এখানে
যোগদান করেই আমি লেজার পোস্টিং করতে যাই। তখন কম্পিঊটার ছিলনা। পনের বিশটি বড়বড়
লেজার একটার পর একটি সারিবদ্ধভাবে প্রায় ৫০ ফুট দীর্ঘ টেবিলে সাজিয়ে রাখা ছিল। জাহাঙ্গির
এবং রিনা দিদি সারাদিন হেঁটে হেঁটে লেজার পোস্টিং করেন। জাহাঙ্গিরের
বাড়ি কুচাই শ্রীরামপুর। বি এ পাস করে তিনি দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকায় কাজ করতেন।
ই এ চৌধুরীর বদন্যতায় জুনিয়র অফিসার হয়ে আসেন পূবালী ব্যাংকে। জাহাঙ্গির
খুবই ভাগ্যবান, তিনি লটারি জেতে পরে ওপি-ওয়ান
ভিসা পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। জুনিয়র ক্লার্ক রিনা দিদি বিয়ানীবাজারের মেয়ে।
তিনি সপরিবারে জিন্দাবাজার শ্রী শ্রী গোবন্দজিউড় আখড়ায় বসবাস করতেন। স্বল্পভাষী
রিনা দিদির মনটা ছিল খুব ভাল। তিনি অনবরত নীরবে কাজ করে
যেতেন। আমরা তিনজন পোস্টিং, ডেবুক লিখা, লেজার চেকিং, প্রগ্রেসিভ এন্ট্রি, চেকবহি
ইস্যু ইত্যাদি নানা কাজ করে ব্যস্ত দিন পার করতাম। মাস শেষে দুই তিনটা করে লেজার
বেলেন্সিং করতাম।
সিনিয়র
অফিসার সৈয়দ কামরান বখত মানবসম্পদ ও বিলস বিভাগের কাজ করতেন। এখানে কাজের অতিরিক্ত
চাপ থাকায় আমাকে পরে তার সাথে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। কামরান ভাইয়ের বাড়ি সিলেট বিভাগের কেন্দ্রস্থল কুশিয়ারাপারের
শেরপুরে, যেখানে এসে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ, এই চারজেলার সীমানা মিশে গেছে।
কামরান ভাই পরে সপরিবারে ক্যানাডা চলে যান।
১৯৯৩ সালের মে মাসে চৌধুরীবাজার শাখার ব্যবস্থাপক আব্দুল ওয়াহিদ বদলি হলে আমি কিছুদিন চৌধুরীবাজার শাখায় অস্থায়ী ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করি। নুতন শাখা চৌধুরীবাজার যেন ছোট একটা ছোট্ট কুয়া, মাত্র চল্লিশ পঞ্চাশটি ভাউচারের ক্লিনক্যাশ মিলাতে হয়। কাজের তেমন কোন চাপ নেই, তাই আমার আজন্ম পরিচিত বন্ধুজনদের সাথে গল্পগোজব করে বেশ আনন্দে সময় কেটে যেত। ক্যাশ সেকশনে কাজ করতেন কুমিল্লার নিরীহ লোক আব্দুল বারি এবং বাহিরের এক টেবিলে লক্ষিপাশার সরল ও একগুয়ে ক্যাশিয়ার কাম ক্লার্ক আব্দুল জলিল বসতেন। বিনয়ী গার্ড মইনুল হোসেনের বাড়ি ছিল খালেরমুখ, তাছাড়া আর দুইজন ম্যাসেঞ্জার ও ক্লিনার কাজ করতেন।
তখন লেনদেন সময় ছিল সকাল ৯টা হতে ১টা, বিকেল ৩/৪টা হবার আগেই সব খেইড় খতম হয়ে যেত। আমার বাড়ির দুরত্ব মাত্র পাঁচ-সাত মিনিটের হাঁটারাস্তা, বাড়িতে গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নামাজ পড়ে অফিসে ফিরতাম। আব্দুল ওয়াহিদ সাহেব আমাকে পরামর্শ দিলেন- কুরেশী সাহেব, এই শাখায় আরাম আছে তাছাড়া আপনি এখানকার লোক, এখানে স্থায়ী ম্যানেজার হয়ে যান, আপনার ভাল হবে, ব্যাংকেরও ভাল হবে। ভাবলাম বেশতো, বিগত দশ বছর ধরে সিলেট শহরে পাগলাঘোড়ার দৌঁড় দিচ্ছি, এই ঘোড়দৌঁড় হতেও রেহাই পাব।
একদিন সিলেট অঞ্চলপ্রধান আব্দুল মজিদ স্যার আমাকে বললেন আপনাকে এখানে পারমানেন্ট করার চিন্তাভাবনা করছি। ভাবলাম শীঘ্রই এই শাখার স্থায়ী ব্যবস্থাপক হয়ে যাব। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর আল্লাহ ঘটান আরেক। একদিন হঠাৎ আমার অফিসে আসেন ব্যাংক চেয়ারম্যান বড়ভাই জনাব ই এ চৌধুরী। তিনি কেন যেন বললেন, ইসফাক, তোমার বাড়িতে চাকুরি করা মনে হয় ঠিক হবেনা। সেইযুগে এলাকায় আমাদের খুব মানসম্মান ছিল, তিনি হয়তো ভাবলেন এখানে জনসাধারণের সাথে আমার ঢলাঢলি ইগো সংকট তৈরি করতে পারে। এই রাজদর্শনের দু’চার দিন পর আবার সিলেট শাখায় ফেরার আদেশ পেলাম। বেশ কিছুদিন বাড়িতে আরামে কাটিয়ে আবার আমি ফিরে গেলাম আমার মুলক্যাম্প সিলেট শাখায়।
দরবস্ত শাখার ব্যবস্থাপক দাড়িওয়ালা সাইদুর রহমান ছুটিতে সাভার গেলে ৭ম জুলাই ১৯৯৩ সালে আমি সেখানে রিলিভিং ম্যানেজারের দায়িত্ব পালনে গমন করি। একই ভবনের অর্ধেক শাখাঅফিস ও বাকী অর্ধেক ম্যানেজারের বাসভবন। দুই সাপ্তাহ এই বাসায় অবস্থান করি। সাইদুর সাহেবের পত্নী হাসিখুশি ও খুবসুন্দরী। তাদের একছেলে ও একমেয়ে নিয়ে ছিল সুখী সংসার। ভাবীর রান্না খাই, তিনি আমাকে খুব আদরযত্ন করেন। বিদায়বেলা কিছু একটা করতে চাইলেও তাদের সীমাহীন বদন্যতায় আমি হেরে যাই। সাইদুর ভাবীর কথা আমার সারাজীবন মনে থাকবে।
জৈন্তার লোকজনের সরলতা আমাকে বেশ
মুগ্ধ করে। একদিন দরবস্তের এক হোটেলে দেখলাম
কিছু মুরব্বী বসে চা পান করছেন। আমরা যেমন
চায়ে বিস্কুট ভিজায়ে খাই, তারা তেমনি জিলাপী চাকাপে ডুবায়ে পরম তৃপ্তির সাথে নাস্তা
করছেন। বিকেলের বিষন্ন বাতাসে পাশের তামাবিল রোডের সেতুর রেলিঙ্গে বসে উত্তরের
আকাশছোঁয়া মেঘপাহাড়ের রূপ দেখে সময় পার করতাম।
দরবস্ত হতে ফিরে আসার কিছুদিন পর ২৭ জুলাই ১৯৯৩ সালে ভাদেশ্বর মোকামবাজার শাখায় যাবার নির্দেশ আসে। ব্যবস্থাপক মামুন বখত স্যারের ছুটিতে রিলিভিং ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভাদেশ্বর পশ্চিমভাগ মসজিদের দক্ষিণসীমায় উঁচু টিলার উপর আমার বড়খালা আবেদা চৌধুরীর বাড়ি। সাহেদ ও বড়খালা এই বাড়িতে থাকেন। আমি এই জনহীন বাড়ির মেহমান হলাম। বাড়িটির নীচ লেবেলে পশ্চিমভাগ জামে মসজিদ, সিঁড়ি বেয়ে উঠে মাঝ লেবেলে বাংলো ও আবার সিঁড়ি বেয়ে আর উপরে উঠে মুলবাড়ির অবস্থান। বাড়ির দুইঘরের আঙ্গিনায় বেশ মনকাড়া দুটি ফুল ও পাতাবাহারের বাগান। সামনে এবাড়ির দাতব্য জায়গায় পশ্চিমভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও খোলা প্রাঙ্গণ।
বাড়িটির উত্তরে
ও দক্ষিণে নিচু টিলায় নির্মিত পাকাবাড়িগুলোর
টিনের চালা এই বাড়ির গ্রাউন্ড লেভেলের অনেক নিচে দেখা যায়। পিছনে ৪০/৫০ ফুট নিচে
বালুচোষা পরিস্কার পানিতে গোটা কয়েক লালপদ্ম বক্ষে ধারণ করে আছে একটি নির্জন পুকুর। এইবাড়ি এককালের
ভাদেশ্বরের সবচেয়ে প্রতাপশালী জমিদার বাড়ি ছিল, যে বাড়ির লোকজন তাদের ভুমিসম্পদের
উপর দিয়ে হেঁটে সুদূর ফেঞ্চুগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছে যেতেন। আমার ছোটগল্প রাতারগুলের ভূতের প্রধান চরিত্র জ্বীন আমুদাদা এই বাড়ির লোককাহিনি হতে এসেছেন।
বাড়িটিতে মানুষ মাত্র আড়াই ঘর। আমার বড়খালা আবেদা চৌধুরী, খালার জ্যা মান্নুর আম্মা ও একজন স্নেহময়ী ফুফু। এই ফুফুকে আমি হাফ ধরলাম এই জন্য যে, বৃটিশ আমলে একজন ম্যাজিষ্ট্রেটের সাথে তার বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু ম্যাজিষ্ট্রেট মহোদয়ের লম্বাদাড়ি তাঁর পছন্দ হয়নি। এই দাড়ি নিয়ে বিরাট সমস্যা তৈরি হল, ক্লিনসেভ না হলে ফুফু ম্যাজিস্টেটের ঘরে যেতে আদৌ রাজি নন। একগুয়ে ম্যাজিষ্ট্রেট মহাশয় বউ হারাতে রাজী কিন্তু দাড়ি হারাতে রাজী নন। শেষমেশ প্রতাপশালী বৃটিশ ম্যাজিষ্ট্রেট তবিয়তে বহাল রাখলেন দাড়ি, হারালেন নববিবাহিতা বধু। অথচ আজকাল দাড়ি ফ্যাশন, দাড়িবিহীন পুরুষ এযুগের মেয়েদের কাছে আনস্মার্ট। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে সালাম জানিয়ে ফুফু এই যে ফিরলেন বাপের বাড়ি, আর কোনদিন কদম ফেলতে যাননি দাড়িওয়ালা ম্যাজিষ্ট্রেটের ঘরে। ফুফু দ্বিতীয় বিয়েও করেননি, এখানে পৈত্রিক ভিটায় কুমারী জীবন কাটিয়ে বুড়ো হয়ে আল্লাহর বাড়ি পারি জমান।
এবাড়ির সামনে ভাদেশ্বর পশ্চিমভাগ শাহি মসজিদে গায়কি গলায় সুমধুর সুরে কেরাতপাঠে নামাজ পড়াতেন একজন সুদর্শন সফেদ ইমাম। এখানে নামাজ পড়ে খুব তৃপ্তি পাওয়া যেত। এই ইমাম ভোরের নামাজে প্রতিদিন মধুরসুরে তেলাওত করতেন, হুয়াল্লাহুল্লাজি লাইয়ালাহা ইল্লাহুয়া, আলিমুল গাইবি ওয়াশ শাহাদাতি হুয়ার রাহমানির রাহিম। সুরা জুমার শেষ তিন আয়াত আমি ফজরের জামাতে এই ইমাম সাহেবের মধুকন্ঠে শুনে শুনে খুব সহজেই মুখস্ত করে ফেলি।
মোকামবাজার শাখায় ব্যবস্থাপক মোঃ মামুন বখত সিনিয়র অফিসার কিন্ত ক্যাশ ইনচার্জ ছিলেন তারচেয়ে এক কদম উপরে একজন প্রিন্সিপাল অফিসার, যিনি ছিলেন কানেখাটো বুড়ো লোক। শাহজাহান নামে কুমিল্লার একজন বাঁচাল ক্যাশিয়ার ছিলেন, যিনি অল্প বয়সে মারা যান।
আমার ফুলবাড়ির ফুফুতো বোন রুনু আপার বাড়ি দক্ষিণ ভাদেশ্বর, সেখানেও যাওয়া হল। রুনু আপার এক পুত্র শ্রীমঙ্গলের উপজেলা নির্বাহী অফিসার ছিল। বিদায়ের দিন মামুন বখত স্যার আমাকে একটি সার্ট উপহার দেন। শাখায় একজন স্থানীয় গার্ড ছিলেন, যার যন্ত্রণায় অফিসের সবাই অতিষ্ঠ। আমাকে সবাই অভিযোগ করলে সিলেট গিয়ে আমি বিষয়টি আঞ্চলিক অফিসের গোলাম মোস্তফা এসপিও স্যারের কানে দেই। তিনি এই গার্ডকে সাথে সাথে এই শাখা হতে অন্যত্র বদলি করে দেন।
১৯৯৪ সালের ২৮ মার্চ আমি আস্থায়ীভাবে চন্দরপুর শাখায় গমন করি। সাতসকালে বের হয়ে পাহাড় লাইনের বাসে প্রথমে ঢাকাদক্ষিণ যাই, সেখান হতে বাসে সোনামপুর গিয়ে খেয়ানৌকায় কুশিয়ারা পার হলেই চন্দরপুর শাখা। কুশিয়ারার ওপারে লন্ডনি অধ্যুষিত ভাটির ধনাট্য গ্রাম চন্দরপুর, কালারুয়া ও বাগিরঘাট। কুশিয়ারা ওপারে কাছকাছি তিনটি শাখা ছিলো আসিরগঞ্জ, বুধবারিবাজার ও চন্দরপুর। এই শাখাগুলো প্রবাসীদের টাকায় টইটুম্বুর। কুশিয়ারা নদীপারের চন্দরপুর বাজারটা যেন ছিল এই ভাটি অঞ্চলের রাজধানী।
এই শাখায় কর্মরত অফিসার আব্দুল আজিজ তালুকদার কিছুটা মানসিক রোগগ্রস্থ ছিলেন। ব্যাংকের কাজের কঠিন
চাপ তার সহ্য হতনা। কাজের চাপ অত্যাধিক হলেই তিনি কাস্টমার ও সহকর্মীদের
সাথে ভীষণ উৎপাত শুরু করতেন। তিনি মেডিকেল ছুটিতে গেলে আমাকে সেখানে পাঠানো হয়।
এই শাখার ব্যবস্থাপক গিয়াসউদ্দিন ছিলেন স্থানীয় লোক। একজন উত্তম ভাবমূর্তির সম্মানী মানুষ হিসাবে এই এলাকায় তার বেশ নামডাক। এখানে এই মর্যাদাবান ব্যবস্থাপক গিয়াসউদ্দিন স্যারের সাহ্নিধ্যে দুইমাস পার করে ১লা জুন ১৯৯৪ সালে আবার সিলেট শাখায় ফিরে আসি। এখানে একটা কুরবানীর ঈদ পাই, ঈদের ছুটির পর কয়েকদিন ধরে বেশকিছু বাড়ি হতে টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার আসে। বার মাইল দুর হতে দৌড়ানো অস্থায়ী কর্মকর্তা আমাকে গিয়াসউদ্দিন স্যার বদন্যতা দেখিয়ে প্রতিদিন বেশ আগেই ছেড়ে দিতেন। গিয়াসউদ্দিন স্যার সুদীর্ঘ ছুটিতে লন্ডন সফরে গেলে আমি প্রায় তিনমাস ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করি। সে সময় ব্যাংকের পক্ষ হতে চন্দরপুর বাজার সংলগ্ন আল এমদাদ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে ২০টি বৈদ্যুতিক পাখা একটি অনুষ্ঠান করে কলেজের অধ্যক্ষা খালেদা খানমের হাতে তুলে দেই। পরে জানতে পারি, এই সুন্দরী অধ্যক্ষা খালেদা খানম আমাদের নর্থইস্ট মেডিকেলের একজন পরিচালক ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ ইউসুফ গজনবীর জীবনসঙ্গিনী ও প্রখ্যাত সিবিল ইঞ্জিনিয়ার মহিউদ্দিনের বোন। অতীব দুঃখের বিষয় চন্দরপুর গ্রামের এই গুণবতী বিদুষী রমণী অল্প বয়সে ক্যান্সারাক্রান্ত হয়ে একমাত্র কন্যা রেখে যুক্তরাষ্ট্রে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চন্দরপুর হতে ফিরে এসে তিন মাসের অবস্থান ভাতা প্রচুর টাকা পাই, যাহা ডাবল বেতনে পরিণত হয়।
বিয়ের প্রায় একবছর একমাস পর আমার অগ্রজ তাহমিদ চৌধুরী ১৯৯৪ সালের ৫ম ফেব্রুয়ারি স্থায়ীভাবে লন্ডনে চলে যান। লন্ডনে চলে যাবার সময় হতে পরবর্তী কয়েকদিন ধরে আম্মা এতই কান্নাকাটি ও অশান্তি করেন যে আমরা সবাই তাকে শান্ত করতে হিমহিস খেয়ে যাই। মাঝে মধ্যে মাঝরাতে তাহাজ্জুদের নামাজে উঠেও কান্না জুড়ে দিতেন। পুত্র তাহমিদ চৌধুরী প্রবাসী হবার শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে আরেক দুঃখ এসে আমার জননী আসমতুন্নেসাকে আঘাত করে। ২৯ মে ১৯৯৪ সালে এদেশে অবস্থানকারী আম্মার দুইভাই শহিদ চৌধুরী এবং আব্দুর রহমান চৌধুরী সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সহসা মায়ের জমজমাট বাপের বাড়ি একদম জনশুন্য বিরানভূমি হয়ে গেল।
আমার তখন
মনে হল, আমিও যদি বিদেশে চলে যাই তবে আম্মা কেঁদে কেঁদে
নির্ঘাত মারাই যাবেন। এদিকে আব্বারও অনেক বয়স হয়ে গেছে। ভাবলাম বিদেশে গিয়ে আমি
যতই সুখী হবার আশা করিনা কেন, শেষমেশ দেশ ছেড়ে গিয়ে হয়ত আমার ভাগ্য বদলাবে ঠিকই
কিন্তু মাবাবাকে চিরজন্মের জন্য হারাতে হবে। সেই তারূণ্যের
দিনে আমি ছোট চাকুরী নিয়ে দারুণ হতাশার সাগরে সাঁতার কাটলেও মনে মনে
সিন্ধান্ত নিলাম, মাবাবা যতদিন আছেন আমি ততদিন দেশেই থাকব এবং আপাততঃ বিদেশে
স্থায়ী হবার আর কোন চেষ্টা করব না।
আমার ছোটচাচি সায়রা খানম চৌধুরী ছিলেন মায়ের প্রতিরূপ। আমার জন্মকাল হতে তাঁর অকৃত্রিম স্নেহমমতা পেয়ে আসি। তাঁর বাপের বাড়ি ছিল বিয়ানীবাজারের কাছে পাহাড়ি গ্রাম মাটিকাটায়। ছেলেবেলায় চাচির কাছে ঘুমাতাম, সাথে একটা হলুদ বিড়ালও ঘুমাতো। বেশ কয়েকদিন ধরে তিনি জ্বর ও মাথাব্যাথায় ভুগছিলেন। একদিন অফিস হতে বাড়ি ফিরে গিয়ে দেখি আমার অতিপ্রিয় সহজ সরল ছোটচাচি সায়রা খানম চৌধুরী তাঁর ঘরের চৌকিতে উত্তরশির হয়ে শুয়ে আছেন চিরনিদ্রায়। শোকাবহ দিনটি ছিল ২৭ মে ১৯৯৪ সাল। মহান আল্লাহ পাক আমার প্রিয় চাচিকে জান্নাতুল ফেরদাউসের বাসিন্দা করুন, আমিন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন