শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

সিলেট শহরে বাসার জমিক্রয়- একটি অর্ধেক স্বপ্নপুরণ

 

সিলেট শহরে বাসার জমিক্রয়- একটি অর্ধেক স্বপ্নপুর

২০০১ সালের সূচনায় আমি খাদিম শাহপরান এলাকা পার হয়ে পীরেরবাজার সুন্দরশাহের মাজার রোডের পাশে টিলার নিচে সস্তাদরে একটি জায়গা ক্রয় করি। দূরের এই জায়গাটি ক্রয় করি লাভের আশায়, বাসা নির্মাণের জন্য নয়। হ্যাঁ, লাভ হল প্রচুর। তিন বৎসর পর খালি জায়গাটি বিক্রয় হল সাড়ে তিনগুণ বেশি দামে, যা পরে আমার বাসা নির্মাণের কাজে লাগে।

এবার সিলেট শহরে আমার বাসার জায়গা কেনার গল্প বলব। আয়ের উৎস হিসাবে ইতিমধ্যে সিলেট স্টেডিয়াম মার্কেটে একটি দোকান ও নর্থইস্ট মেডিকেল কলেজের একটি মালিকানা কিনা হয়ে গেছে। তাই ভাবলাম এবার বাসা নির্মাণে এগুতে পারি। আমার হাতে তেমন টাকা নেই, তবুও এই শহরে একটি বাসার জমিক্রয়ের স্বপ্নপূরণে দৌড়ঝাঁপ শুরু করলাম আমার গিন্নীর কর্মক্ষেত্র সিলেট মেডিকেল রোড, সিলেট স্টেডিয়াম ও তেলিহাওরের নর্থইস্ট মেডিকেল। এই লাইনে তাকে পেশাগত দায়িত্ব পালনে সর্বদা রোগীর পিছনে দৌড়াতে হয়। ভাবলাম আমাকে এমন একটি জায়গা কিনতে হবে যেখান থেকে সহজে এই লাইনে প্রবেশ ও প্রস্থান করা যায়।  জমির খোঁজে মাঠে নেমেই বুঝলাম কাজটা যতটা সহজ মনে করেছিলাম ততটা সহজ নয়, হাতে টাকা থাকলেই জায়গা কিনে নেয়া যায়না। এই লাইনে অজস্র দালাল, বাটপার, গুন্ডা, মস্তান, ঠগ সুবিধা নিতে ওৎপেতে নির্লজ্জ বেহায়ার মত বসে থাকে। আমি সিন্ধান্ত নিলাম কোন দালাল বাটপারকে এক টাকাও দেবনা, ওদেরকে উপেক্ষা করে সরাসরি জমি মালিকের কাছ থেকে জমি কিনব।

বিগত দুবছর ধরে জমি খোঁজে বেড়াই এই শহরের পাড়ায় পাড়ায়। কাজলশাহ ও মুন্সিপাড়ায় জমি দেখতে যাই, স্থানদুটি ঘনবসতি ও রাস্তা সংকীর্ণ। ভাতালিতে গেলাম, আশপাশে বস্তি, পরিবেশ নোংরা। নওয়াব রোডে সুন্দর জায়গা আছে, কিন্তু জমির মালিকেরা বিদেশে ও বিক্রেতারা দালাল বাগবাড়ি গেলাম, পাশে মরাটিলা কবরগাহ। পশ্চিম কাজলশাহে জমির পাশে বইছে দুর্গন্ধভরা ময়লার খাল। 

শেষে কেওয়াপাড়াতে পুলিশ বস্তির ধারে চার ডেসিমেল জায়গার উপর নির্মিত একটি টিনের বাসা খোঁজে পেলাম। এখানেও বাসার মালিক বিদেশে, দেখাশুনা করেন তার এক আত্মীয় প্রাইমারি টিচারদরদাম সাব্যস্ত হল তের লক্ষ টাকা। এই বাসাটি চুড়ান্ত পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখি বাসাটি দখল করে বসে আছে এক রাজনৈতিক দলের ক্যাডার। এই দলীয় ক্যাডার বছরের পর বছর প্রবাসীকে ভাড়া দিচ্ছেনা, বাসাও ছাড়ছেনা। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিক্রেতা বললেন ঐ দুষ্ট ভাড়াটিয়াসহ বাসাটি আপনাকে কিনে নিতে হবে। তিনি আমাকে বুদ্ধি ফরমালেন, আপনি বাসাটি কিনে নিয়ে যদি গ্যাস বিদ্যুৎ ও পানির লাইন কেটে দেন তবে এই মাস্তান শালা আর টিকবে কতক্ষণ। ভদ্রলোক তিন বৎসরে যাহা করতে পারেননি, আমাকে তিনদিনে তা কিভাবে করা যায় সেই সহজ রাস্তা বাতলে দিলেন। প্রবাসী দেশে ফিরলেন, দুষ্ট ভাড়াটিয়া কোন ভাড়াতো দিলনা। তার কাছ হতে উল্টো প্রচুর ইনাম আদায় করে বাসা ছাড়ল। এবার আমি নিশ্চিন্ত মনে বাসাটি রেজিষ্ট্রি করার জন্য এগিয়ে গেলাম কিন্তু বিক্রেতা বললেন, আপনি দয়াকরে ফিরে যান এই বাসাটি এখন আর বিক্রয় করা হবেনা। বিক্রেতার কাঁধে সওয়ার হওয়া শয়তান আপদটা বিদায় হয়েছে, তাই প্রবাসীর ভাবনাও বদলে গেছে। 

এবার বাসা কিনতে ছুটলাম লামাবাজার নয়াপাড়া। জায়গার মালিক একজন বয়স্ক হিন্দু ভদ্রলোক রানু বাবু। সামনে আমাদের ঘনিষ্ঠজন দাউদপুর গ্রামের এলিট পারসন এডভোকেট অরুণ ভূষণ দাশের বাসা। তিনি সব দেখলেন ও বললেন কাগজপত্রে কোন ভেজাল নেই। হিন্দু প্রতিবেশীবেষ্টিত জায়গাটি আমার মোঠামোঠি পছন্দ হল। প্রতি ডেসিমেল জায়গার দাম নির্ধারণ করা হল ২,৭৫,০০০/= টাকা। পাঁচ ডেসিমেল একটি প্লট কেনার দরদাম করা হল। কোন এক ঘন বৃষ্টির দিনে গাড়ি নিয়ে আমি ভাতালি নয়াপাড়া ঢুকলাম। তখন দেখি রাস্তা ও ড্রেন বন্যার জলে একাকার হয়ে একটি খালে পরিনত হয়েছে। গাড়িটাকে রাস্তার জলে ঢেউ তুলে সাঁতার কেটে কেটে খুব কষ্টে চালিয়ে নিয়ে যাই। 

এইদিন সিন্ধান্ত নিলাম নয়াপাড়ার এই জলেডোবা জায়গা আমি কিনবো না। রানু বাবুর টাকার খুব প্রয়োজন, তিনি তার ভাতিজাদেরকে আমার পিছু লাগালেন। তারা এসে বলত আপনাকে আমাদের দারুণ ভাল লেগেছে কাকা, আমরা প্রতিবেশী হিসাবে আপনাকে পেতে চাই। তারা আমাকে খোঁজে, আর আমি পালাই। এই চোর পুলিশ খেলা যখন চলছিল, তখন অমনি একজন লন্ডনি এসে চিলের মত ছুমেরে প্রতি ডেসিমেল ৩,০৫,০০০/= টাকা দরে জায়গাটি কিনে নিয়ে আমাকে উদ্ধার করলেনএকেই বলে ভাগ্য, আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম, রানু বাবু ঢের বেশি ডাব্বা মারলেন

ইঞ্জিনিয়ার নুরুল আমিন ও তার পত্নী দুজন সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট হতে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে জীবনসংগ্রামের মাঠে যুদ্ধরত। আমার পলিটেকনিকের সিনিয়র নুরুল আমিন জমি কিনবেন, আমিও কিনবোআমরা দুজন জমি কিনতে গেলাম শামিমাবাদ, বাগবাড়ি। এগার ডেসিমেল একটি প্লট আমরা দুইজন মিলে কেনার সিন্ধান্ত নেই। এই এলাকার জমিদার মরহুম মইনউদ্দিন ছিলেন ব্যবসায়ী ও কূটকৌশলী লোক। সুরমাপারে অটো রাইস মিলের ব্যবসা ছিল তারতিনি ছলে বলে কৌশলে এখানে একরের পর একর জমি একত্রিত করে তার একমাত্র পুত্র শামিম আহমদের নামে গড়ে তুলেন শামিমাবাদ আবাসিক এলাকা, বাগবাড়ি, সিলেট। এই আবাসিক এলাকার প্রতিটি রাস্তা তার পরিবারের কোন না কোন সদস্যের নামে নামকরণ করেন তিনি এখানে নিজ নামে প্রতিষ্ঠা করেন মইনউদ্দিন মহিলা কলেজ। 

জমিদার মইনউদ্দিনের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন তালতলা গোলশান হোটেলের মালিক কুতুবউদ্দিন আলোচনা করতে প্রথমদিন  গোলশান হোটেলের পিছনে তার সুরম্য রাজপ্রাসাদে আমরা পা রাখলাম। রাজপ্রাসাদ বললাম এজন্য যে এটা দিল্লির পুরাতন মোঘল বাদশাহি প্রাসাদগুলোর ডিজাইনে নির্মিত। এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও রাজকীয়। এক সংকীর্ণ গোপন গলিপথ ধরে অগ্রসর হয়ে কুতুবউদ্দিনের বাসার দরবার কক্ষে প্রবেশ করলাম। ঘন গোঁফওয়ালা স্থুলদেহের কালো জমিদার সাহেব দরবার কক্ষের কোনায় স্থাপিত সোফায় এসে সম্রাট আকবরের মত বসলেন, তারপর আমাদের সাথে আলোচনা শুরু হলতার এক শালিকা সেফু খানম আমার পত্নীর মৌলভীবাজার স্কুলের সহপাঠিনী। এই পরিচয় দিয়ে বেশ সম্মানও পেলাম। কুতুবউদ্দিনের আরেক শালিকার স্বামী বিখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী ফকির আলমগির।

কুতুবউদ্দিন বললেন আপনারা নিজেদের জন্য প্লট কিনবেন, নাকি অন্য কারো জন্য কিনতে এসেছেন। শেষপর্যন্ত বুঝলাম তিনি জানার চেষ্টা করছেন আমরা জমির দালাল কিনা। আমরা নিজেরা জমি ক্রয় করব শুনে জমিদার কুতুবউদ্দিন বললেন তিনি এক কথার লোক, তার জমির মূল্যও একদর, প্রতি ডেসিমেল ১,১০,০০০/= টাকা। তবে কোন দালাল মারফত ক্রেতা এলে এক্ষেত্রে প্রতি ডেসিমেল ১,২০,০০০/= টাকা, এখানে ১০,০০০/= টাকা দালালের কমিশন। আমরা  দালাল ছাড়া নিজেরাই কিনতে এসেছি, তাই আমাদের দর ডেসিমেল প্রতি ১,১০,০০০/= টাকাই দিতে হবে। অন্যকোন ক্রেতার দালাল হয়ে কিনে দিতে এলে ১০,০০০/= করে প্রতি ডেসিমেলে আমরা প্রচুর টাকা দালাল কমিশন পেতাম।

তারপরও আমরা দামদরে একটু রেয়াতের চেষ্টা করলে জমিদার আবার সাফ জবাব দিলেন, আমি এক কথায় মানুষ, আমি দোসরা আলাপ করা পছন্দ করিনা এই দামের এক টাকা কমে হবেনা, এক টাকা বেশি দিলেও হবেনা। হয় আপনারা এই দরে কিনবেন নয়তো ফুটবেন, এই আমার শেষ কথা।

এবার কুতুবউদ্দিন সাহেব তার মুহুরী অমল দাস মোগলাবাজারিকে ডাকলেন। মুহুরী বড় একগাট্টি দলিল দস্থাবেজ নিয়ে জি হুজুর বলে এসে হাজির হন। এই মুহুরী অমল বাবু জমিদারের ডানহাত, তাই অমল বাবুর মাধ্যমেই সবকিছু করতে হবে। নুরুল আমিন ভাই একলক্ষ টাকা অগ্রিম এগিয়ে দেন, কিন্তু জমিদারের শালিকা সেফুর খাতিরে আমার কোন অগ্রিম টাকা পরিশোধ করতে হলনা দুইচার দিনে রেজিষ্ট্রেশনের কাগজপত্র প্রায় প্রস্তুত হয়ে গেল, এবার নুরুল আমিন ভাই তার সহপাঠী সিলেট পৌরসভার সার্ভেয়ার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার অরবিন্দ বাবুকে ডাকলেন। অরবিন্দ বাবু জরিপ করে বললেন প্লটটির অবস্থান বর্ণিত দাগে নয়, অন্য কোথাওদুইদিন পরই যে জমিটি রেজিস্ট্রেশন করার কথা ঠিকঠাক, এখন কি আর করা যায়। আমরা আবার গোলশান হোটেলে গিয়ে জমিদার মইনউদ্দিন সমীপে ধর্না দিলাম

ধানক্ষেতে গড়ে উঠা এই আবাসিক এলাকার প্লটগুলো কোনটি কোন দাগে যে ঢুকে পড়েছে তা কেঊ জানেনা। অথচ লোকজন সস্তা দরে পেয়ে এতকিছু যাচাই বাছাই না করেই একের পর এক প্লট কিনে নিচ্ছে। আমরা বিষয়টি বলতেই কুতুবউদ্দিন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, আমার জমি কিনতে পাবলিক ঠেলাঠেলি করছেকালকে রেজিস্ট্রি আর আজ আপনারা এসেছেন আমার জমির ভেজাল বের করতে আমি কোটি টাকা দিলেও আপনাদের কাছে প্লট বেচবোনা।

জমিদার সাহেব রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে দুতলায় গিয়ে নুরুল আমিনের কিছুদিন আগে অগ্রিম প্রদত্ত এক লক্ষ টাকার ভান্ডিল এনে মেঝে ছুড়ে মেরে বললেন, আমি এক কথার মানুষটাকার ভান্ডিলটা হাতে নিয়ে ভীত নুরুল আমিন ভাই বললেন, কুরেশি ভাই চলুন, আমরা পালাই। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এই প্লটের পরিবর্তে পাশের অন্য কোন সঠিক প্লট কিনে নেব। কিন্তু এই এককথার লোকের সাথে কোন দোসরা আলাপ করার সাহস আর আমাদের হলনা। আমি নুরুল আমিন ভাইকে বললাম, আর একটা আওয়াজ বের করবেন তো ভদ্রলোকের হাতে মার খাবেন, আসুন পৈত্রিক প্রাণ ও সম্মানটা নিয়ে এবার দৌড়ে পালাই। সাথে ছিলেন নুরুল আমিন ভাইয়ের শ্বাশুড়ি, তিনি নাকি কুতুবউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এই ভদ্রমহিলাও আমাদের সাথে পালিয়ে জমিদার আত্মীয়ের চিপাকল হতে সেদিন প্রাণে বাঁচলেন। 

তিনবার বড়শিতে মাছ লাগল কিন্তু আমার পক্ষে কোনবারই মাছ শিকার করা সম্ভব হল না। কিছূটা হতাশ হয়ে আমি এবার ছুটলাম সাগরদিঘির পার। এখানে চাক্কা শামিম জমি বিক্রি করবেন। আশি ফুট প্রশস্থ রাস্তার পাশে সুন্দর জায়গা, আশপাশে চিরসবুজ গ্রাম্য পরিবেশ। তিনি ইফতেখার হোসেন শামিম, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এক সময়ের সিলেটের জাঁদরেল ছাত্রনেতা হতে আজ তিনি সর্বজনগণ্য একজন নেতা। একবার তিনি চাকা প্রতীক নিয়ে সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হন। এই নির্বাচনে জেতে পৌর চেয়ারম্যান হবার সৌভাগ্য তার না হলে কি হবে, জনগণের কাছ থেকে তিনি একটি চৌকশ নাম উপহার পেয়ে হয়ে যান “চাক্কা শামিম”

তখনকার দিনের দুরন্ত পাগলা ঘোড়া সিলেট জেলা ছাত্রলিগের লাগাম ছিল শামিম সাহেবের হাতের মুঠোয়, তাই লোকে তাকে ভয় পেত। তারা বলল কোরেশি সাহেব, আপনি চাক্কা শামিমের জমি কিনতে যাচ্ছেন। “চাক্কা শামিম” আপনার পিঠে ছুরির ঘা বসিয়ে দিলে পালংকে শুয়ে শুয়ে  ক্রন্দন করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবেনা। কিছুলোক আমাকে সাবধান করে বলল এই জমিতে মামলা ছিল তাই ভেজাল থাকতে পারে। সিলেট জজ কোর্টের সিনিয়র উকিল মাশিয়াত উল্লা চৌধুরী ছিলেন আমার ফুফুতো ভাই। আমি তাকে জমির কাগজপত্র পরীক্ষা করার দায়িত্ব দিলাম। তিনি শামিম সাহেবের সুদর্শন উকিল শ্রী প্রবির ভট্টাচার্য্যকে তার ঈদগাহের বাসা ‘তখতে তাউসে’ বেশ কিছুদিন ডেকে নেন ও তাকে নিয়ে কাগজপত্র তন্নতন্ন করে পরীক্ষা করেন অবশেষে একদিন তিনি রায় দেন ভবিষ্যতে কোন সমস্যা হবেনা, এই জমি নিঃসংকোচে কেনা যায়।

কোন এক শুক্রবার আমার অনুজ নিশাত কুরেশিকে নিয়ে শামিম সাহেবের জিন্দাবাজারের বাসায় আলোচনায় বসলাম। অতীব ধুর্ত শামিম সাহেব ছাটা গোঁফের তলায় লুকানো ঠুটে মিষ্টি মিষ্টি হাসি হেসে এডভোকেট প্রবির ভট্টাচার্য্য ও এডভোকেট ইয়াকুতুল বাসিত শাহিনকে নিয়ে আমাদের সামনে বসলেন। আলোচনায় প্রায় ৬ ডেসিমেল জায়গার দরদাম এগার লক্ষ টাকা সাব্যস্ত হল আমি জানতাম আর দশজন আবাসন ব্যবসায়ীর মত চাক্কা শামিম প্লটের জমি সংগ্রহে ছলচাতুরীর আশ্রয় নিলেও তার কাছ থেকে জায়গা কিনে আজ পর্যন্ত কেউ কোনদিন ঝামেলায় পড়েনি। তার উপবন আবাসিক এলাকায় প্লট কিনেও কোন ক্রেতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তার ক্রেতারা সব সময় নিরাপদ থাকেন। 

২০০১ সালের জুলাই মাসের কোন একদিন আমার সার্ভেয়ার অরবিন্দ বাবু ও এডভোকেট প্রবির ভট্টাচার্য্য গিয়ে জমির সীমারেখা নির্ধারণ করে খুঁটি স্থাপন করে দেন। সীমানারেখা টানার পরদিন বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বলে আমি সিলেট জেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে চৌধুরী ইসফাকুর রহমান কুরেশী ও নুরজাহান বেগম চৌধুরী এই যৌথনামে জমিটির মালিকানা দলিল রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করলাম রেজিস্ট্রেশন বাবদ খরচ হল আর সত্তুর হাজার টাকা। অনেক অনেক ব্যর্থতার পর চতুর্থবারের প্রচেষ্টায় শিকার এসে শেষমেশ হাতে ধরা দিল। জমিটি ক্রয়ের পরক্ষণেই এডভোকেট শ্রী প্রবির ভট্টাচার্য্যকে দিয়ে আমি জমিটি আমাদের যৌথনামে নামজারি করিয়ে নেই।

জমি কেনা শেষ করে বেশ স্বস্তিতে কয়েকদিন কেটে গেল। হঠাৎ একদিন খবর আসল আমার প্লটের উত্তর সীমানার খুঁটিগুলো উপড়ে ফেলছেন হেলালের বাপ। তিনি হেলালের বাপ, তার নাম কেউ জানেনা, তবে সবাই তাকে তার পুতের নামে চিনে। একবার একজন পন্ডিত একটি বৃক্ষের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, বৃক্ষ তোমার কিসে পরিচয়? তখন বৃক্ষটি জবাব দিয়েছিল- আমার ফলে পরিচয়। আমি প্লটে গিয়ে একজন লোকের কাছে হেলালের বাপের নাম জানতে চাইলে লোকটি বলল একটু সামনে এগিয়ে যান পেয়ে যাবেন। সামনে আমার বাসার উত্তরসীমায় এগিয়ে গেলে লোকটা বলল ডানদিকে হেলালের বাপের অপদখলি বস্তির লেট্রিনের ওয়ালে খোঁজ করুন। তিনি দীর্ঘকাল ধরে উত্তরদিকে সরকারি মৎস্যখামারের তিনবিঘা জমি জুরপুর্বক দখল করে নিয়ে বস্তি নির্মাণ করে ভাড়া দেন। বস্তির ছিন্নমুল লোকজনকে দাস খাটান। বস্তির কাঁচা পায়খানার ওয়ালে এবার তাকিয়ে দেখি আলকাতরা দিয়ে লেখা- এই জমির মালিক তজম্মুল আলী।

এবার ময়লা লুঙ্গি ও তেলচিটকা গেঞ্জিপরা তজম্মুল আলী ওরফে হেলালের বাপকে সামনে পেলাম। তিনি একদম গেয়ো চেহারার একজন বেঁটে ছোটখাটো বয়স্ক লোক ভীষণ তিরিক্ষ মেজাজের সাথে তাঁর থুথুনিতে রয়েছে কগাছি চেংগিসখানি ছাগলী দাড়িতিনি সর্বদা কোন না কোন বাজে সন্ত্রাসীদেরকে পোষতেন। তার বাদিপুত্র গোলজারকে লাটিয়াল হিসাবে ব্যবহার করতেন। তিনি তার পোষা গোলাম, গরুর রাখাল, ড্রাইভার, চাকর বাকর সবাইকে মারামারি ও গুন্ডামির কাজে ব্যবহার করতেন। তার বাসার সামনে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সর্বদা লেগেই থাকত। লন্ডন প্রবাসী পুত্ররত্ন হেলাল মিয়া এককালে ছাত্রলিগের একজন ভয়ংকর হোমরা চোমরা নেতা ছিলেন। তাই ঐ বৃক্ষের মত হেলালের বাপেরও নামে নয়, শেষমেশ ফলে পরিচয়। 

হেলালের বাপ দাবি করলেন তার জমির বেশ কিছু জায়গা নাকি আমার কেনা প্লটে ঢুকে গেছে। আমার প্লটের উত্তর সীমানা তিনি মানেন না। আবার ছুটে যাই চাক্কা শামিমের দরবার শরিফ। শামিম সাহেব তার উকিল প্রবীর ভট্টাচার্য্যকে দেখে দিতে বললে প্রবীর বললেন, স্যার আমাকে দিয়ে এর সমাধান হবেনা, আপনি সিলেটের প্রখ্যাত জরিপবিদ এডভোকেট আব্দুস সবুর চৌধুরীকে পাঠান। এবার বেশ কয়েকটি ব্লাকশিল্ড পাজারোতে একদল সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে শামিম সাহেব তার জমির উত্তর সীমারেখা টানতে সাগরদিঘির পারে আগমন করলেন। এডভোকেট আব্দুস সবুর চৌধুরী তার দল নিয়ে যে বেঞ্চমার্ক হতে শিকল টানতে শুরু করলেন হেলালের বাপ তা মানলেন না। তিনি আর দুইতিন ফুট দূর হতে মাপতে বাধ্য করলেন। শেষপর্যন্ত হেলালের বাপের ঠেলায় পড়ে উত্তরের সীমারেখা বরাবর প্রায় দুইতিন ফুট জায়গা হেলালের বাপের জবরদখলি সরকারি মৎস্যখামারের এক একর আয়তনের দাগে ফেলে আসতে বাধ্য হন সিলেটের তৎকালীন আওয়ামী রাজনীতির খলনায়ক ইফতেখার হোসেন শামিম ওরফে চাক্কা শামিম।

আর কিছুদিন পর সামনের গাড়ি মেরামত কারখানার একজন শ্রমিক আমাকে খবর দিল আপনার প্লটে মাটি ভরাট করে হেলালের বাপ তার গাড়ি রাখার গ্যারেজ তৈরি করা শুরু করেছেন। আমি তখনই আমার প্লটের সামনে তার টিনের বাসায় গিয়ে হাজির হই। সামনে রাস্তার পাশে তার একতলা মার্কেট। পিছনে রাস্তা হতে অনেক নিচে তার বাসা। সামনের আঙ্গিনায় হাঁটুজল ডিঙ্গিয়ে বাসায় ঢুকে বললাম আমি শীঘ্রই বাসার নির্মাণ কাজ শুরু করব, কাজেই এখানে গ্যারেজ নির্মাণের কোন অবকাশ নেই। তিনি রেগেমেগে লোক লাগিয়ে তখনই সব মাটি অপসারণ করে নেন। জমিটি কেনার পর আমি কিছু খুঁটি কিনে সীমানায় তারের বেড়া দেই, যাতে ভবনের ভিত্তির কাজ সমাধা করে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করতে পারি। কিন্তু হেলালের বাপের নানা যন্ত্রণায় বাধ্য হয়ে শেষে পাকা বাউন্ডারি ওয়াল তৈরি করে ফেলতে বাধ্য হই

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন