শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

স্পিকার হুমাউন রশিদ চৌধুরী সকাশে একশীতের সকালবেলাঃ

 

স্পিকার হুমাউন রশিদ চৌধুরী সকাশে এক শীতের সকালবেলাঃ

প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্যের এক অপরূপ লীলাভূমি সিরাজনগর চাবাগান। রশিদ ওয়াকফ এস্টেটের এই বাগানটি মরহুম স্পিকার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমাউন রশিদ চৌধুরীর মাতা সিরাজুন্নেছা চৌধুরীর নামে প্রতিষ্ঠা করেন তার স্বামী বৃটিশ আমলের ডিপোটি ম্যাজিস্টেট আব্দুর রশিদ চৌধুরী। মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলায় আটশত একর পাহাড়ি জায়গা জুড়ে বাগানটির অবস্থান। চাবাগান, রাবার প্ল্যান্ট, পাহাড়ি লেক, মৎস্য খামার, দুগ্ধ খামার, ধানক্ষেত, ফলবাগান, চারাগাছ প্ল্যান্ট, আগর বাগান, ছায়াবৃক্ষ, এমন কি বেশ বড়সড় মৌমাছি খামারও এই বাগানে রয়েছে। 

রশিদ ওয়াকফ এস্টেটের এই সুন্দর বাগানটির সার্বিক দায়িত্বে আছেন জাহানজেব রশিদ চৌধুরীর পত্নী দিলারা আপা, যিনি আমার দুলাভাই আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরীর চাচাত বোন। আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী তার গ্রামের চেয়ারম্যানি পরিচালনার সাথে এই বাগানটির ম্যানেজার হিসাবে দায়িত্ব পালন করতেন। প্রতিবছর শীতে দিলারা আপা তার দুই পুত্র ও একমাত্র কন্যা সাবরিনাকে নিয়ে এই বাগানে আসতেন। সাবরিনা অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি করে এখন সেখানে কর্মরত আছে। দিলারা আপার ভাই জিনবিজ্ঞানী ডঃ আবেদ চৌধুরীও অস্ট্রেলিয়া হতে মাঝে মাঝে এসে চাবাগানের মিলনমেলায়  যোগ দিতেন। 

আমি প্রকৃতিকে উপভোগ করতে দুইতিন দিনের জন্য প্রায়ই এই সুন্দর চাবাগানে ছুটে যেতাম। বাগানের চার পাশের অজস্র জাতের ফুলের সহাস্য রূপ ও সুবাসে সে মন ভরে যেত। বারান্দার সামনে আজোয়া খেজুরগাছে ফুলসহ ঝুলে থাকত থোকা থোকা খেজুর। লেকে ডুবসাঁতার দিত পরিযায়ী জল বিহঙ্গরা। সবুজ টিয়ারা পাতায় পাতায় একাকার হয়ে যেত। অনবরত শোনা যেত একটি পাখির গান- ‘বউ কথা কও, বউ কথা কও’কিংবা থেমে থেমে কানে বাজত কুকিলের কুহু কুহু সুমধুর সুর। দিনদুপুরে ডানবামে শেয়ালের ক্রন্দনধ্বনি হুঁ ক্কা হুয়া, হুঁ ক্কা হুয়া, হুয়া হুয়া হুয়া নির্জন বনভূমি কাঁপিয়ে দিত। 

সিরাজনগর চাবাগানের সুউচ্চ টিলায় চিরশায়িত আছেন একজন ইংলিশ মহিলা, যিনি কয়ছর রশিদ চৌধুরীর পত্নী ছিলেন। এই মহিলা ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় নিযুক্ত বৃটিশ রাষ্ট্রদুতের কন্যা। ভালবেসে বিয়ে করে সব ফেলে চলে আসেন বাংলাদেশে। কয়সর রশিদের বেশ কজন সন্তানের মাও হন তিনি। কিন্তু যুবতী বয়সে ঘাতকব্যাধী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অকালে মারা যান। এই চাবাগানকে তিনি প্রাণভরে ভালবাসতেন। তার শেষ ইচ্ছা পূরণে এই বাগানের সুন্দর উচ্চভূমিতে তাকে একটি উইলো বৃক্ষের তলায় দাফন করা হয়। 

বাগান বাংলোর বাহিরের পাকঘরে রান্নাবান্না হত, খাবার পরিবেশন করে কর্মীরা ডাইনিং টেবিলে বসানো ঘন্টি বাজাত। আমরা সবাই ঘন্টি শুনে একসাথে এসে খেতে বসতাম। বাহিরে জ্বলন্ত অঙ্গারের আগুনে সেকে মাংস পুড়িয়ে তৈরি করা হত মজাদার শিক কাবাব। পোষা গাইয়ের গামলা ভরা দুধ ও পাত্র ভরা থাকত মমসহ খাঁটি মধু। আমরা মধুর সাথে মম চিবাতাম, এযেন অনেকটা আজকের দিনের চুইঙ্গাম। মৌয়াল ছিলেন একজন খাসিয়া কর্মী, তিনি মৌ-খামারের মধুসংগ্রহ করে বড়বড় পাত্র ভরে ফেলতেনমাছধরার টিম মৎসের সেবাযত্ন করত, তারা উড়াল জাল দিয়ে সদ্যধরা জ্যান্ত মাছ এনে পাকশালের গামলা ভরে দিত।  

বাগানের দেয়ালের সাথে গাঁথা ছিল শতাব্দী প্রাচীন একটি কালো শিবমূর্তি, কিছুদিন আগে শুনলাম মুল্যবান এই শিবমূর্তিটি চোরে নিয়ে গেছে। ডাইনিং কক্ষে ছিল অপুর্ব সুন্দরী একজন নারীর অর্ধ উলঙ্গ তৈলচিত্র, সিটিং রোমে ছিল প্রাচীন গ্রীকদের উলঙ্গ রণদেবী এথেনার স্টিলের মূর্তি। ডাইনিং কক্ষের নিচে খাঁচাবন্দি ছিল একটি সজারু। বারান্দার দেয়াল সেফে ছোরা, বল্লম ও তরবারি সাজায়ে রাখা। দুলাভাই আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী একসময় সপরিবারে ক্যানাডা চলে যান, তারপর আমার পদচিহ্ন পড়েনি এই স্মৃতিময় চাবাগানে আর কোনদিন। জানিনা এখন কেমন আছে সেই স্মৃতিময় বাংলো ও উদ্যান।    

তিনদিকে পাহাড়ি লেইক ও একদিকে পাহাড় সংযুক্ত দুইটি টিলার উপরিভাগ সমতল করে সামনের টিলায় একটি বাগানঘেরা দুতলা ডুপ্লেক্স বাংলোবাড়ি। এই বাড়ির ডিজাইন এতই সুন্দর ও বৈচিত্রময় যে কেউ এর ডিজাইনারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ না হয়ে পারবেনা। বাংলোর পিছনের টিলা সমতলে টেনিস গ্রাউন্ড, দোলনা ও ব্যায়ামের হুইলার রয়েছে। কয়েক সিঁড়ি নিচে নেমে একটি সুন্দর সেতু, লেকের উপর স্থাপিত অপূর্ব এই কাটের সেতু হেঁটে পার হয়ে এই বাগান বাড়িতে ঢুকতে হয়। গাড়ি রেখে আসতে হয় লেকের ওপারের গ্যারেজে। লেকের গাঘেঁষা জলের উপরে বরশি বাওয়ার দারুণ একটা কাঠের মঞ্চ। 

মনে পড়ে, তখন জানুয়ারি ১৯৯৮ সাল। একরাতে তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ন রশিদ চৌধুরী এই বাংলোয় রাত্রিযাপন করেন। তিনি এই ডুপ্লেক্স ভবনের উপরতলার বড় কক্ষে এবং আমি নিচের একটি কক্ষে ঘুমিয়ে রাত পার করি। লেকের বাহিরে সরকারি পুলিশ ও ভিতরে বাংলোর নিরাপত্তা কর্মীরা পাহারা দেন। সকালে গিয়ে ড্রয়িং রোমের সোফায় বসে আছি। এমন সময় প্রশান্ত মনে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আমার সামনের সোফায় এসে বসেন বাংলাদেশের জানু কূটনৈতিক, সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও তখনকার স্পিকার হুমাউন রশিদ চৌধুরী। দারুণ কর্মব্যস্ত এই প্রতিভাকে সেদিন মনে হল যেন বিশ্রামে আছেন। আমার পরম শ্রদ্ধার এই মানুষকে এত কাছে পেয়ে আমি তার কাছে তার সংগ্রামি জীবনকাহিনি শুনতে চাই। সুশান্ত ও অতিভদ্র মানুষটি আমাকে বঞ্চিত করলেন না। বললেন শৈশবে পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে বড় হয়ে ওঠার বিচিত্র সব কাহিনি। পাঞ্জাবের সর্দারদের লম্বাকার গাড়ি কেনার প্রতিযোগিতার কাহিনিও শুনালেন। গাড়ির জাতপাত কোম্পানি মডেল কিছু নয়, যার গাড়ি যত লম্বা তাঁর তত সম্মান। পাঠানদের সরলতা ও সততার কাহিনিও আলোচনায় বাদ পড়েনি। এই মহান মানুষটি অনেক আগে গত হয়েছেন। আল্লাহপাক তাঁকে জান্নাত দান করুন, আমিন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন