শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

আমার জনক সফিক চৌধুরী ও জননী আসমতুন্নেছার হজ্জযাত্রাঃ

 

জনক সফিকুর রহমান চৌধুরী ও জননী আসমতুন্নেছার হজ্জযাত্রাঃ

তখন ১৯৯৮ সাল। আমার জননী আসমতুন্নেছা ছিলেন খুব ধর্মপরায়াণা মহিলা। তাঁর আজীবনের লালিত স্বপ্ন পবিত্র হজ্জপালন করা। আমার লন্ডনের ভ্রাতা তাহমিদুর রহমান চৌধুরী বললেন, আমি সম্পূর্ণ খরচ বহন করব, আম্মা ও আব্বা দুইজনেরই হজ্জযাত্রার ব্যবস্থা করা হউক। আম্মার সামান্য মাত্রায় ডায়বেটিস হলেও তিনি ছিলেন তখন মোঠামুঠি শক্ত সামর্থ্যআব্বা সফিক চৌধুরীর বয়স তখন আশি বৎসর হলেও শরীরে কোন রোগ ছিলনা, না প্রেসার, না ডায়বেটিস, না গ্যাষ্টিক। কেবল শুনতে একটু সমস্যা হত মাত্র। 

আলম ট্রেভেলসের মালিক হাউজিং এস্টেটের সাহাবউদ্দিন ভাই ছিলেন আমাদের খুব ঘনিষ্ঠজন। তিনি ছাতকের সৈয়দপুর গ্রামের আমাদের একজন আত্মীয় পীরসাহেবের মুর্শিদ। সাহাবউদ্দিন ভাই তাঁর কয়েক পুরুষ পরম্পর আত্মীয় পীরসাহেবের মুরিদ হওয়ার সুবাদে নিজ পীরের এই স্বজনদের হজ্জযাত্রার কাজ সাশ্রয় ও যতনের সহিত আয়োজন করেন। রনকেলী গ্রামের আমাদের কয়েকজন আত্মীয় এই হজ্জযাত্রী দলে শরিক হন

হজ্জ করে প্রচুর টাকা হাতে রয়ে গেলে আম্মা মালামালের সাথে সোনার কিছু অলংকার নিয়ে আসেন। দেশের ঘনিষ্ঠজনদেরকে সোনার বালা, দুল, হার, অংটি ইত্যাদি উপহার দেন। আম্মার ধারণা ছিল লন্ডন আমেরিকায় অর্থ ও সোনাদানার বন্যা বয়, তাই লন্ডনের বড়ভাবীকে সোনা দান নিষ্প্রয়োজন, তাই তাকে তিনি কোন সোনাদানা দেননি। পরে হজ্জের খরচদাতা বড়ভাবী এই তথ্য জেনে কিছুটা মনঃক্ষুন্ন হন। অবশ্য আম্মা আমার লন্ডনের ভাতিজি নওসিনকে একটি সোনার চেইন উপহার দেন।

তারা মদীনা হতে ক্রয় করে অর্ধমন খেজুরপুর্ণ একটি বড়ব্যাগ অতিকষ্টে বিমানে করে নিয়ে আসেন। সব মালামাল সাথে এলেও খেজুরের ব্যাগটি বিমান কতৃপক্ষ বললেন পরে আসবে। সিলেট এয়ারপোর্টের মাল গোদামে তিনচার দিন তাদের কথামত মেমো নিয়ে  দৌড়াদৌড়ি করি, কিন্তু বিমান কতৃপক্ষ খেজুরব্যাগটি খোঁজে বের করে দিতে ব্যর্থ হন অনেক প্রচেষ্টা ও অভিযোগের পর অবশেষে আমরা এই খেজুরের আশা চিরতরে ছেড়ে দেই, জানিনা এই কুড়ি কেজি খেজুর বাংলাদেশ বিমানের কোন খাদক দলের উদরে গেছে।    

হজ্জ হতে ফিরে এসে আম্মা ছোটখাট ইন্দোনেশিয়ান হাজিদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। কালো নিগ্রোয়েড মানুষের চেহারা সুরত পোশাক আশাক ও বিশেষ করে তাদের কাবাঘরের দিকে পা ছড়ায়ে বসার গল্প বলতেন। যখন তার সাথি মহিলারা হোটেলের কক্ষে বসে যখন মেয়েলি আলাপে নিমগ্ন হয়ে অলস সময় পার করতেন, মা তার মুল্যবান সময়টা তখন যতটুকু সম্ভব মক্কা ও মদিনার মসজিদে কাটাতেন। সাথি মহিলাদের দেশে কার কি পরিমান ধনসম্পদ আছে বয়ান শুনে মা মনে মনে ওয়াস্তাগফিরুল্লাহ পড়তেন। 

আম্মা আসমতুন্নেছা মসজিদে নবুবিতে একদিন রসুলের (সঃ) রওজা মোবারক জেয়ারত কালে হজরত আবুবকরকে(রাঃ) তার মাজারের উপর দেখে ফেলার এক অদ্ভুদ কাহিনি শুনানআমি বললাম বিষয়টি তোমার চোখে হয়ত একধরনের সম্মোহন হতে পারে। তখন আম্মা আমাকে বললেন, হজরত আবুবকরকে(রঃ) আমি বয়ঃবৃদ্ধ, হালকা দাড়িওয়ালা, চিকনতনু ও মুবারক চেহারায় দেখেছি তিনি বললেন তার এই দেখাটা এতই সুস্পষ্ট ছিল যে, প্রচন্ড শিহরনে তার সারাটা শরীরের সবকটি লোম খাড়া হয়ে যায়, দুচোখ বয়ে অশ্রুর ঢল নামে ও তিনি চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠেন। এই গল্পটি তিনি আমি ও আমাদের পরিবারের দুই একজন ছাড়া কাউকে বলতেন না বরং এই বিষয়টি তিনি কাউকে না বলে গোপনই রাখতেন। মায়ের মৃত্যুর এত বছর পর আমি তার এই গোপনীয় খবরটি প্রকাশ করলাম এবং তাঁর সন্তান হিসাবে আমার আত্মজীবনীতে সবার জন্য উম্মুক্ত করে দিলাম।

৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ সাল। এবার আশরাফুল আলম ভাইয়ের রিলিভিং ডিউটিতে ছুটলাম বাসিয়া নদীরপার বিশ্বনাথে। সুনামগঞ্জের ভাটিঅঞ্চল তাহিরপুরের আশরাফ ভাইয়ের সাথে আমি ইতিপুর্বে সিলেট শাখায় কাজ করি। সেখান থেকে তিনি ব্যবস্থাপক হয়ে বিশ্বনাথ শাখায় আসেন। তিনি ধার্মিক ও হৃদয়বান লোক। তার জায়া ভাটি অঞ্চলের এক অপরূপা সুন্দরী। আশরাফুল আলমের কোন সন্তান ছিলনা। তাদের মনে সন্তান না পাওয়ার এক প্রচ্ছন্ন যন্ত্রণা ছিল। এই মনঃযন্ত্রণার মধ্যে একসময় পত্নীর সাথে তাঁর ছাড়াছাড়িও হয়ে যায়। আশরাফুল আলম পরে ডিজিএম হয়ে অবসরে যান। আমি বিশ্বনাথবাসীর সান্নিধ্যে এক সাপ্তাহ কাটিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি সিলেট শাখায় ফিরে আসি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন